Tuesday , September 21 2021
Breaking News
Home / খবর / করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব

করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব

 

করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব

স্টাফ রিপোর্টার :  করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেডেই চলছে। মূলত রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিয়েছে। চলতি জুলাই মাসের ২৫ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩০৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় (গত শনিবার সকাল আটটা থেকে গতকাল রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি মাসে ১৩০৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ডেঙ্গু সন্দেহে মারা গেছে পাঁচ জন। রোগীর তথ্য পর্যালোচনার জন্য সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পাঠানো হয়েছে। তবে চলতি বছর ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেনি আইইডিসিআর। দেশে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় ডেঙ্গুর এই প্রাদুর্ভাবকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তারা বলছেন, মধ্য আগস্টে এটি পিকে উঠবে। থেমে থেমে বৃষ্টি এবং ঈদুল-আজহার কারণে জমে থাকা পানি ও রক্তে ডেঙ্গু আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। তবে জুন থেকে সেপ্টেম্বর এই চার মাস মূল মৌসুম। কয়েক দিনের থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টি এডিস মশার বংশবিস্তারে প্রভাব ফেলছে। করোনা আর ডেঙ্গুর উপসর্গ কাছাকাছি হওয়ায় জ্বর হলে বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৬৭৯ জন। এর মধ্যে গতকাল ৪৬০ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তাদের ৪৫৪ জনই ভর্তি হয়েছেন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে। আর বাকি ছয়জনের মধ্যে গাজীপুরে ৩ জন, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং খুলনায় একজন করে রোগী ভর্তি।

গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে দৈনিক ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিল ১০০ জন। জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ২৭২ জন। জুলাই মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরো বেশি বাড়তে শুরু করেছে। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এর আগের সব বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছিল। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩০০ মানুষ প্রাণ হারায়। আর সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৭৯। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে, ওই বছর সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন।

গত বছর ডেঙ্গুর এত প্রকোপ দেখা যায়নি। দুই সিটি কর্পোরেশন চিরুনি অভিযানসহ বেশ কিছু কার্যক্রম চালায়। এবার ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলোকে নিয়ে একাধিক প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন প্রতিদিন সকালে মশার লার্ভা মারার জন্য লার্ভিসাইডিং এবং বিকেলে উড়ন্ত মশার মারার জন্য অ্যাডাল্টিসাইডিং করছে। ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল নির্মূলে দুই সিটির পক্ষ থেকে চিরুনি অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

পরিষ্কার পানি জমা হয়, এ রকম পাত্র, ফুলের টব, হাঁড়ি-পাতিল, চিপসের প্যাকেট বাড়ির আশপাশে না রাখতে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। দু-তিন দিনের বেশি সময় যাতে কোথাও পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল দৈনিক জনতাকে বলেন, করোনার মধ্যে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকলে রোগী ব্যবস্থাপনা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। মশকনিধনে দুই সিটি কর্পোরেশনের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতে জনগণের সচেতনতাও জরুরি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আমাদের দেশে দুই দশক ধরে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। কখনোই এটি নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়নি। মশা নিধনের আধুনিক পদ্ধতিও নেয়া হয়নি। নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি খুবই দুর্বল। এমনকি মশা নিধনের কীটনাশক আমদানিতে প্রায় ৯০ শতাংশ ডিউটি দিতে হয়। তাছাড়া মশা মারা এবং উৎপত্তিস্থান ধ্বংসের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। কীটনাশক আমদানির অনুমোদন দিয়ে থাকে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং চিকিৎসার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। তবে কেউই তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মশক নিধনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। ফলে প্রতিবছরই ডেঙ্গুকে সঙ্গী করেই আমাদের বসবাস করতে হচ্ছে।

কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর চৌধুরী সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, রোগী বাড়তে শুরু করেছে। আগস্টের মাঝামাঝি এটা পিকে উঠতে পারে। তাই এটি নিয়ন্ত্রণে এখনই ক্লাস্টার পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। কোনো এলাকা থেকে রোগী বেশি আসছে, সেই এলাকাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। পরবর্তী ১৪ দিন সেসব এলাকা থেকে যদি নতুন রোগী আসে, তাহলে ওই এলাকাগুলো অ্যাক্টিভ ক্লাস্টার হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অ্যাক্টিভ ক্লাস্টারে পরিণত মশা, লার্ভিসাইট ও এডিসের সোর্স ধ্বংস করতে হবে। প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে অন্তত দুইদিন এবং পরবর্তী সময়ে সপ্তাহে একদিন করে মশক নিধন কার্যক্রম চালাতে হবে। এর পাশাপাশি এবার ডেঙ্গুর কোন সেরোটাইপ দ্বারা সংক্রমণ ঘটছে, সেটি নির্ণয় করতে হবে। ২০১৯-এর সেরোটাইপ হলে আতঙ্কের কিছু নেই। কিন্তু যদি অন্য কোনো সেরোটাইপের সংক্রমণ হয়, তাহলে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর যাদের হেমোরেজিক বা শক সিনড্রোম দেখা যাচ্ছে না বা যারা খুব দুর্বল হয়ে পড়ছেন না, তারা পরীক্ষাও করাতে যাচ্ছেন না। ফলে অনেক রোগী থেকে যাচ্ছেন শনাক্তের বাইরে। এছাড়া এখানে শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দেখানো হয়। কিন্তু কতজন পরীক্ষা করে পজেটিভ হয়েছেন, অর্থাৎ ডেঙ্গু রোগীর প্রকৃত সংখ্যা জানানো হচ্ছে না। এছাড়া ডেঙ্গুর চিকিৎসা দিয়ে থাকেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে, কোভিড চিকিৎসা দিয়ে থাকেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা। দেশের ভয়াবহ কোভিড পরিস্থিতির কারণে হাসপাতালগুলোর মেডিসিন ওয়ার্ড কোভিড ওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। এমনকি অনেক হাসপাতাল পুরোপুরি কোভিড হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়েছে। সব চিকিৎসক কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত। এই মুহূর্তে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ ধারণ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, করোনা একটি অদৃশ্য শক্তি, যার বিরুদ্ধে আমরা লড়ছি। কিন্তু ডেঙ্গু আমাদের পরিচিত শত্রু। আমরা জানি, এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগ হয়। ঘরে-বাইরে পানি জমলেই এই মশা ডিম পাড়ে। সেখানে হাজার হাজার মশা জন্মায়। তাই এই রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ঘরে-বাইরে কোথাও যেন পানি না জমে। ঘরে ও ঘরের আশপাশের পানি সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। পানি জমলেই মশা জন্মাবে। এছাড়া মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকতে হবে। দিনে-রাতে যখনই ঘুমাবেন, তখনই মশারি টানাতে হবে। ছোট শিশুকে ফুল শার্ট-প্যান্ট পরাতে হবে। কোথাও যেন মশার লার্ভা জন্মাতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সমন্বিতভাবে মশক নিধন করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা ডেঙ্গু রোগী পাচ্ছি। তাই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

গত ৩ মে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা মৌসুম-পূর্ব এডিস সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটির ৩২নং ওয়ার্ডের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মশার লার্ভার ঘনত্ব সর্বোচ্চ ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে লালমাটিয়া ও ইকবাল রোড। এছাড়া দক্ষিণ সিটির ৪৮নং ওয়ার্ডের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে সায়েদাবাদ ও উত্তর যাত্রাবাড়ী এলাকা।

২৯ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত এই সার্ভে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৪টি ওয়ার্ডে লার্ভার ঘনত্ব ১০ থেকে ২০-এর মধ্যে। এগুলো হলো-১৩নং ওয়ার্ড (মনিপুর, পীরের বাগ, শেওড়াপাড়া), ৩১নং ওয়ার্ড (নূরজাহান রোড, আসাদ এভিনিউ, শাহজাহান রোড), ৩৫নং ওয়ার্ড (মগবাজার, নিউ ইস্কাটন), ৩৬নং ওয়ার্ড (মধুবাগ, নয়াটুলা, মিরবাগ) এলাকা। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৬টি ওয়ার্ডে লার্ভার ঘনত্ব ১০ থেকে ২০-এর মধ্যে পাওয়া গেছে। এগুলো হলো-১২নং ওয়ার্ড (মালিবাগ, গুলবাগ, শান্তিবাগ), ১৯নং ওয়ার্ড (মিন্টু রোড, বেইলি রোড, কাকরাইল), ৩৪নং ওয়ার্ড (সিদ্দিকবাজার, ওসমান গণি রোড), ৩৮নং ওয়ার্ড (ঠাটারি বাজার, গোপী মোদন মোহন বসাক লেন, মোদন মোহন বসাক লেন), ৩৯নং ওয়ার্ড (আরকে মিশন রোড, অভয় দাশ লেন), ৪৬নং ওয়ার্ড (মিল ব্যারাক, আলমগঞ্জ রোড, অক্ষয় দাশ লেন)।

প্রাক-মৌসুম জরিপ ২০২১-এ মেঝেতে জমানো পানিতে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ২২ শতাংশ ডেঙ্গু মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এছাড়া প্লাস্টিক ড্রামে ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ, প্লাস্টিক বালতিতে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ, পানির ট্যাংকে ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ, পানির মিটারের গর্তে ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ, ফুলের টব ও ট্রেতে ২ দশমিক ২৫ শতাংশ, প্লাস্টিক বোতলে ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং লিফটের নিচে ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ মশার লার্ভা পাওয়া গেছে

 

Check Also

বন্ধ ঘোষণার পরও মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিপুলসংখ্যক অবৈধ যান

স্টাফ রিপোর্টার : সরকার একাধিকবার বন্ধ ঘোষণার পরও দেশের সহাসড়কগুলোতে বিপুলসংখ্যক অবৈধ যান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *