Monday , May 10 2021
Breaking News
Home / বাংলাদেশ / চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ

চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ

চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ

K khan : টানা ৭ দিনের লকডাউন চলছে। আজ ষষ্ঠ দিন। বাসা থেকে বের হতে লাগছে মুভমেন্ট পাস। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ। লকডাউনে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাহাকার শুরু হয়েছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে। অনেকের পক্ষে সংসারের খরচ চালানোই এখন কষ্টকর। লজ্জায় কারো কাছে হাত পাথতে পারছে না। ফলে এসকল পরিবারগুলোর মধ্যে এক ধরনের চাপা কান্না বিরাজ করছে। যা দেখার কেউ নেই।

এদিকে করোনাভাইরাস মহামারীর ১৩ মাস পার হলেও সুখবর নেই কর্মসংস্থানে। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা না হওয়ায় বেসরকারি খাতের অবস্থা এখনো নাজুক। এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে ব্যয় সংকোচনের চেষ্টা করছে। কাজ হারিয়ে অনেকেই পেশা বদলে যে কাজ পাচ্ছেন তা করেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। খরচ কমাতে পরিবার গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে মেসে উঠেছেন রাজধানীর অনেক মানুষ। জোড়াতালির সংসারের খরচ মেটাতে নিম্নআয়ের পরিবারের বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন রোজগারের আশায়। একইসাথে রাজধানীজুড়ে বেড়েছে ভিক্ষুকের সংখ্যাও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই সন্তানের জননী আয়েশা বেগম কাজ করেন মালিবাগ হাজীপাড়ার একটি গার্মেন্টে। স্বামী আয়নাল মিয়া রিকশা চালান। দু’জনের আয়েই চলে সংসার। ২০১৯ সালে বড় মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করার পর খরচ বেড়ে যায়। স্বামীর পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়লে ওই বছরই ৬ হাজার টাকা বেতনে গার্মেন্টে চাকরি নেন আয়েশা বেগম। স্বামী-স্ত্রীর আয়ে ভালোই চলছিল সংসার। একটি ব্যাংকে মাসে এক হাজার টাকা করে সঞ্চয়ও শুরু করেন তারা। কিন্তু গত বছর মহামারী করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে বদলে যায় জীবনের গতি। নিজের চাকরি থাকলেও ভাটা পড়ে স্বামীর আয়ে। সংসার চালাতে ভাঙতে হয় জমানো টাকা। ধীরে ধীরে যখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছিল, তখনই আবার আঘাত হেনেছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। করোনা সংক্রমণ রোধে জনগণের চলাচলের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। এতে আয়েশার স্বামীর আয় অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। সেই সাথে বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তি। ফলে সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন এই দম্পতি। আয়েশা বলেন, টিনশেডের দুই রুম ভাড়া নিয়ে থাকি। মাসে ৮ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। আমার আয়ের পুরোটা দিয়েও বাসা ভাড়ার খরচ মেটানো যায় না। স্বামী আগে মাসে ১৫-১৮ হাজার টাকা আয় করত। গত বছর করোনা শুরু হওয়ার পর সেই আয় কমে ১০ হাজার টাকার নিচে চলে আসে। এখন লকডাউন দেয়ায় দিনে দু’শ-তিনশ টাকা আয় করাও কষ্টকর হয়ে গেছে। অথচ এখন এক কেজি চাল কিনতে ৫০ টাকার ওপরে লাগে। তেলের লিটার ১৩০ টাকার ওপরে। বাজারে বেশিরভাগ সবজির কেজি ৫০ টাকার বেশি। এবার বোঝেন, আমাদের সংসার কীভাবে চলছে! আবু বকরের বয়স ৪০ ছুঁয়েছে। গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনা জেলায় হলেও জীবিকার তাগিদে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায়। সংসারে স্কুলপড়ুয়া তিন সন্তান নিয়ে কোনোমতে দিন কাটান। সঞ্চয় বলতে আছে একটিমাত্র রিকশা, সেটাও এনজিও থেকে কিস্তিতে টাকা নিয়ে কেনা। সরকার ঘোষিত লকডাউনেও তিনি রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন। আবু বকর বলেন, রিকশা চালানোর উপার্জনেই চলে আমার সংসার। এক দিন চাল না কিনলে ঘরে চুলা জ্বলে না। পাঁচজনের সংসারে দৈনিক ৩০০-৪০০ টাকা খরচ হয়। এ ছাড়া মাস শেষে ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও এনজিওর কিস্তি তো আছেই। বসে থাকলে কেউ খাবার দেবে না। তিনি জানান, করোনার ঝুঁকি থাকলেও রিকশা নিয়ে বের হতেই হবে। না হলেও পরিবারের সবাই না খেয়ে থাকবে। সন্তানদের মুখে খাবার দিতে না পারলে খুব কষ্ট হয়। একই অবস্থা অটোরিকশাচালক আবদুল হাকিম ও মো. সবুজ মিয়ার। শুধু আবু বকর কিংবা অটোচালক আবদুল হাকিম ও মো. সবুজ মিয়া নয়, রাজধানীজুড়ে হাজারো রিকশা, অটোরিকশার সাথে জড়িত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারে দুশ্চিন্তার ভাজ পড়েছে। যদিও নগরের অলি-গলিতে স্থানীয় কাউন্সিলর কিংবা প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় বিশেষ কার্ড দিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চলাচল করে। অটোচালক মো. সবুজ মিয়া জানালেন, তারা তিন ভাই। সবাই অটো চালান। সবাই মিলে মায়ের চিকিৎসাসহ বাড়ির খরচ চালান। রিকশাচালক আবদুর রহিম বলেন, তিনি বেশ কয়েক বছর বনশ্রী এলাকায় রিকশা চালান। গতবার লকডাউনের সময় কষ্ট করে রিকশা চালিয়েছেন। তিনি বলেন, স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে ৩ জনের সংসার। ছোট ছোট ছেলে মেয়ে। এক দিন রিকশা না চালালে আমরা খেতে পারি না। চা দোকানি সেলিম বলেন, গত লকডাউনে আমরা ঠিকমতো দোকান খুলতে পারিনি। কিন্তু ভাড়া ঠিকই দিতে হয়েছে। এবারের প্রথম লকডাউনে দোকান খুলেছি, পুলিশ এলে বন্ধ করি। পুলিশ গেলে আবার খুলি। গত বছর করোনায় লকডাউনের সময় সরকারি- বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগে অনেকে খাদ্যপণ্য সাহায্য করলেও এবার নেই সেই সহযোগিতাও। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গত ১৪ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার লকডাউনের পঞ্চম দিনে ও কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। বিনা কারণে কাউকে বের হতে দিচ্ছে না। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাদের অবস্থা কঠিন থেকে আরো কঠিন হয়ে উঠছে। মিরপুর-১০ নম্বর ফুটপাতে প্যান্ট বিক্রেতা রাসেল জানান, গত বুধবার থেকে টানা ৫ দিন ধরে পুলিশ ফুটপাতে বসতে দিচ্ছে না। তিনি বলেন, আমাদের কি জমানো টাকা আছে নাকি যে চাল-ডাল কিনে ঘরে মজুত করে রাখব। মিরপুর গুদারাঘাটে একটি রিকশা গ্যারেজের ম্যানেজার জুয়েল রানা জানান, তার গ্যারেজের দুই-তৃতীয়াংশ রিকশা চালক গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। যারা আছেন তারা বাধ্য হয়ে আছেন। কারণ গ্রামে গিয়েও তাদের কোনো কাজ নেই। রিকশাচালকদের দুর্দশার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, তাদের (রিকশা চালক) সবারই আয় অর্ধেকে নেমে গেছে। এখানকার আয় দিয়ে তারা গ্রামে পরিবারের ব্যয় মেটান। তাদের জমানো কোনো টাকা নেই। লকডাউন চলছে, রিকশাচালকের দুর্দশার কোনো সীমা থাকবে না। রিকশাচালক ওয়াসিমের কথায় জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে তার আয় অর্ধেকে নেমে গেছে। গ্রামে থাকা পরিবারের কাছে টাকাও পাঠাতে পারছেন না। লকডাউনে রিকশা চালাতে না পারলে অবস্থা আরো করুণ হয়ে পড়বে। শ্রমজীবী মানুষদের চাইতে আরো করুণ দশা নিম্ন মধ্যবিত্তদের। তাদের বালিশ চাপা কান্না যেন আরো করুণ। রাজধানীর নাখালপাড়ার বাসিন্দা নাজমুল হোসেন চাকরি করতেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। করোনার কারণে গত বছরের শেষ দিকে কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকায় আসে তার নাম। এরপর জমানো টাকায় কোনোমতে চার সদস্যের পরিবার নিয়ে জীবন চালালেও এখন রিক্ত হস্ত তার। একসময়ে ভালো জীবনযাপনে অভ্যস্ত মধ্যবিত্তের কাতারে থাকা নাজমুল এখন নিম্নবিত্তের কাতারেও নিজেকে ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। না পারছেন কারো কাছে সাহায্য চাইতে, না পারছেন নতুন কোনো কর্মসংস্থান করতে। বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরিরত আরিফুল ইসলাম বলেন, মাসে ২২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করি। বাসা ভাড়া চলে যায় ১২ হাজার টাকা। বাকি টাকা দিয়ে সংসারের অন্যান্য খরচ মেটাতে হয়। সব মিলিয়ে অবস্থা এমন দাঁড়ায়, মাসের শেষ কয়েকদিন চলাই কষ্টকর হয়ে যায়। আমি নিজে দুপুরে কোনো রকমে খেয়ে থাকি। তিনি বলেন, ঢাকায় চাকরি করি, তাই গ্রামের সবাই ভাবে, খুব ভালো আছি। আসলে আমাদের সংসার যে কীভাবে চলে তা গ্রামের বাড়িতে যারা থাকেন তাদের বোঝানো যায় না। কোনা রকমে খেয়ে না খেয়ে ঢাকায় টিকে আছি। কোনো সঞ্চয় নেই। গরুর মাংস কালেভদ্রে কপালে জোটে। ব্রয়লার মুরগিও মাসে দুই-তিনবারের বেশি কেনা সম্ভব হয় না।

 

Check Also

ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের মেয়াদ বাড়লো

ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের মেয়াদ বাড়লো

বেনাপোল স্থলবন্দর ভারতের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে দেশটির সঙ্গে স্থলসীমান্ত বন্ধের মেয়াদ আরও ১৪ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *