Saturday , May 8 2021
Breaking News
Home / বাংলাদেশ / ধরন বদলে ভয়ঙ্কর রূপে করোনা

ধরন বদলে ভয়ঙ্কর রূপে করোনা

স্টাফ রিপোর্টার:  করোনার ধরন পাল্টে যাওয়ায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু। গত বছর চূড়ান্ত সংক্রমণের সময়ও এত অল্প সময়ে রোগীর পরিস্থিতি খারাপ হতে দেখেননি চিকিৎসকরা। বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে অধিকাংশ রোগীকে। কিন্তু এ বছর শুধু হাসপাতালের চিকিৎসায় চলছে না, প্রয়োজন পড়ছে আইসিইউর। আর সেখানেই বাধছে বিপদ। সোনার হরিণ আইসিইউ জোগাড় করতে রোগীর স্বজনরা পড়ছেন বিপাকে। শয্যা ফাঁকা না থাকায় হাসপাতালগুলো বাধ্য হচ্ছে রোগী ফিরিয়ে দিতে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনাভাইরাসের জিন বিশ্লেষণে নতুন দুটি ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে। যার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অত্যধিক সংক্রমণকারী ভেরিয়েন্টের মিল রয়েছে। এবার অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তবে ভাইরাসের এই গতি পরিবর্তন বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এখনো আমাদের কাছে এমন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই যাতে করে বলা যায়, করোনাভাইরাসের নতুন কোনো ধরনের কারণে সংক্রমণ বেড়েছে। তবে সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে ভাইরাস মিউটেটেড হয়ে শক্তিশালী হতে পারে। তৈরি হতে পারে নতুন ধরন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি করোনা সংক্রমণের হার ছিল ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। মাত্র এক মাস চার দিনের মাথায় গতকাল সংক্রমণ হার এসে পৌঁছেছে ২৩.২৮ শতাংশে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের হার। গতকাল শনাক্ত হয়েছে ছয় হাজার ৮৩০ জন। এর আগের টানা তিন দিন দৈনিক পাঁচ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে গত ২৯ মার্চ পাঁচ হাজার ১৮১ জনের, ৩০ মার্চ পাঁচ হাজার ৪২ জন ও ৩১ মার্চ পাঁচ হাজার ৩৫৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ছয় লাখ ১৪ হাজার ৫৯৪ জন। একই সময়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরো ৫০ জন। গত বুধবারের তুলনায় গত বৃহস্পতিবার মৃত্যু কমেছে। গত বুধবার ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এখন পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন নয় হাজার ১৫৫ জন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে দেয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত অ্যান্টিজেন ও আরটি-পিসিআর পদ্ধতিতে ২৯ হাজার ৩৩৯টি নমুনা পরীক্ষা করে করোনায় আক্রান্ত আরো ছয় হাজার ৮৩০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। মার্চের শুরু থেকেই দেশে পুনরায় করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তা দ্রুত গতিতে বাড়ছে। গত ২৬ মার্চ শনাক্তের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২৭ মার্চ তা বেড়ে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ, ২৮ মার্চ ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ, ২৯ মার্চ ১৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ৩০ মার্চ ১৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ, ৩১ মার্চ ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ ও গত বুধবার ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশে দাঁড়ায়। গতকালসহ টানা এক সপ্তাহ যাবৎ গড়ে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬। গত ২৭ মার্চ মারা গেছেন ৩৯ জন, ২৮ মার্চ ৩৫ জন, ২৯ মার্চ ৪৫ জন, ৩০ মার্চ ৪৫ জন, ৩১ মার্চ ৫২ জন ও গত বুধ মারা গেছেন ৫৯ জন।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৫০ জনের মধ্যে ৪০ জন পুরুষ ও ১০ জন নারী। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে তাদের মধ্যে একজনের বয়স ২১-৩০ বছরের মধ্যে, দুইজনের বয়স ৩১-৪০ বছরের মধ্যে, চারজনের বয়স ৪১-৫০ বছরের মধ্যে, ১১ জনের বয়স ৫১-৬০ বছরের মধ্যে ও ষাটোর্ধ্ব ৩২ জন। ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন দুই হাজার ৪৭৩ জন। এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ৪১১ জন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৪৭ লাখ ২৮ হাজার ১১৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, দেশে মোট পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ। আর মোট শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৮৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ ও মৃত্যুর হার এক দশমিক ৪৭ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে সারাদেশে মোট আইসিইউ বেডের সংখ্যা ৫৯৬। এর মধ্যে বর্তমানে ফাঁকা রয়েছে ২১৩টি। আর ঢাকা মহানগরীতে আইসিইউ বেড রয়েছে ৩০৬টি। এর মধ্যে ফাঁকা রয়েছে ৫০টি। গতকাল পর্যন্ত সারাদেশে ৫৪ লাখ ১২ হাজার ৭৯১ জনকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেয়া হয়েছে।

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে আসছেন ডা. তুষার মাহমুদ। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই চিকিৎসক ও করোনা গবেষক গণমাধ্যমকে বলেন, গত বছরের জুন-জুলাইয়ে করোনা আক্রান্ত সর্বোচ্চ রোগী ছিল। তখন আমার চিকিৎসা দেয়া ১০০ জন রোগীর মধ্যে তিনজনকে হাসপাতালে পাঠাতে হতো। অথচ এই কয়েক দিনে ১০০ জন রোগীর ২০ জনকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। এসব রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়ায় আইসিইউ সাপোর্টও লাগছে। যে পদ্ধতিতে চিকিৎসা দিয়ে এতদিন রোগী সুস্থ করে তুলেছি এখন আর তা কাজ করছে না। করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট আসায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, রোগীদের জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে তরুণদের হার বেশি। তাই সুস্থ থাকতে হলে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ কয়েক প্রকারের করোনাভাইরাসের ভেরিয়েন্ট। প্রথম করোনাভাইরাসের যে ভেরিয়েন্ট সারাবিশ্বে সংক্রমণ ঘটিয়ে ছিল সেটি কোভিড-১৯। এরপর দ্বিতীয় ভেরিয়েন্টের নাম ইউকে ই-১১৭, তৃতীয় ভেরিয়েন্টের নাম ইউকে ই-১৫২৫, চতুর্থ সাউথ আফ্রিকান ভেরিয়েন্ট ই-১৩৫, পঞ্চম ভেরিয়েন্ট ব্রাজিলিয়ান পি-১। করোনাভাইরাসের জিন বিশ্লেষণে নতুন দুটি ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে। যার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অত্যধিক সংক্রমণকারী ভেরিয়েন্টের মিল রয়েছে। এবার অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

ভাইরাসের এই গতি পরিবর্তন বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এখনো আমাদের কাছে এমন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই যাতে করে বলা যায়, করোনাভাইরাসের নতুন কোনো ধরনের কারণে সংক্রমণ বেড়েছে। তবে সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে ভাইরাস মিউটেটেড হয়ে শক্তিশালী হতে পারে। তৈরি হতে পারে নতুন ধরন। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমাদের দেশে জিনোম সিকোয়েন্সিং বাড়াতে হবে। সেটা করা না গেলে আমরা বুঝতেই পারব না যে আমাদের দেশে নতুন ধরন তৈরি হচ্ছে কিনা বা সেটার শক্তি-সামর্থ্য কেমন। তিনি আরো বলেন, টিকা নেয়ার পর অনেকেই নিজেকে নিরাপদ ভাবতে শুরু করেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বাদ দিয়েছেন। বাংলাদেশে সংক্রমণ পাঁচ ভাগের নিচে নেমে এসেছিল। মৃত্যুও কমে এসেছিল। বাংলাদেশে টিকা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর আমরা দেখছি, পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আমাদের অংশগ্রহণ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে গরম চলে এসেছে। ঘরে বা বদ্ধ রুমে যখন আমরা মিলিত হচ্ছি, তখন ফ্যান বা এসি ছাড়তে হচ্ছে। ঘরের বাতাস যেহেতু ঘরের মধ্যেই চলাচল করছে, তাই সংক্রমণের মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে।

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চূড়ায় (পিক) উঠেছিল গত বছরের জুন-জুলাই মাসে। ওই সময়ে, বিশেষ করে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার রোগী শনাক্ত হতো। বেশ কিছুদিন পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকার পর এক মাসের বেশি সময় ধরে সংক্রমণ আবার ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে ছয় দিন ধরে সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী (প্রতিদিন) শনাক্ত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরেকটি চূড়ার (পিক) দিকে যাচ্ছে দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি।

২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের ঘোষণা আসে। দেশে প্রথম করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তির মৃত্যুর ঘোষণা আসে ১৮ মার্চ।

 

Check Also

খুলনায় স্বাস্থ্যবি‌ধি ভু‌লে চলছে গায়ে গা লাগিয়ে কেনাকাটা

খুলনায় স্বাস্থ্যবি‌ধি ভু‌লে চলছে গায়ে গা লাগিয়ে কেনাকাটা

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা ব্যুরো:  মহামারী করোনা মানছে না মার্কেট গুলিতে বেশির ভাগ সময় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *