Monday , May 10 2021
Breaking News
Home / বাংলাদেশ / আইন ও বিচার / অভিজিৎ হত্যা : ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড একজনের যাবজ্জীবন

অভিজিৎ হত্যা : ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড একজনের যাবজ্জীবন

অভিজিৎ হত্যা : ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড একজনের যাবজ্জীবন

স্টাফ রিপোর্টার :   মুক্তমনা বস্নগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং এক আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল মত প্রকাশের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা, আর সে কারণে এ মামলার আসামিরা কোনো ‘সহানুভূতি পেতে পারে না’ বলে পর্যবেক্ষণ এসেছে আদালতের রায়ে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে জিয়া, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন (সাংগঠনিক নাম শাহরিয়ার), আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব, আকরাম হোসেন ওরফে আবির ও মো. আরাফাত রহমান। যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত আসামি হলেন শফিউর রহমান ফারাবি। তাদের মধ্যে মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে জিয়া ও আকরাম হোসেন ওরফে আবির শুরু থেকেই পলাতক। বাকি চারজন কারাগারে রয়েছেন। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, অভিজিৎ রায়কে হত্যার উদ্দেশ্য হলো জননিরাপত্তা বিঘি্নত করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ ও নিরুৎসাহিত করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশ না করতে পারে। আসামিদের সাজার সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিচারক তার রায়ে বলেন, বাংলাদেশে জননিরাপত্তা বিপন্ন করার জন্য আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণকে মত প্রকাশ ও স্বাধীন কর্মকা- থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে অভিযুক্ত আসামিদের কারো ভূমিকা ছোট বড় করে দেখার সুযোগ নেই।

যেহেতু অভিযুক্ত পাঁচজন আসামি সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া, আকরাম হোসেন, মো. আবু সিদ্দিক সোহেল, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন ও মো. আরাফাত রহমান ওরফে সিয়াম আনসার আল ইসলামের সদস্য হিসাবে সাংগঠনিকভাবে অভিজিত রায় হত্যায় গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন, সেজন্য ওই ৫ জন আসামির একই সাজা প্রদান করা হবে বলে বাঞ্ছনীয়।

বিচারক বলেন, অভিজিৎ রায় হত্যায় অংশগ্রহণকারী অভিযুক্ত আসামিরা বেঁচে থাকলে আনসার আর ইসলামের বিচারের বাইরে থাকা সদস্যরা একই অপরাধ করতে উৎসাহী হবে এবং বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্তমনা

লেখকেরা স্বাধীনভাবে লিখতে এবং মত প্রকাশ করতে সাহস পাবেন না। কাজেই উক্ত আসামিরা কোনো সহানুভূতি পেতে পারে না।

আদালত বলেছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ এর ৬(২)(অ) ধারায় এই পাঁচ আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ- দেয়া হলেই নিহতের আত্মীয়রা ‘শান্তি’ পাবে এবং মুক্তমনা লেখকেরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ‘সাহস’ পাবে। অন্যদিকে জঙ্গিরা ভবিষ্যতে এমন জঘন্য অপরাধ করতে ভয় পাবে এবং নিরুৎসাহিত হবে। অপর আসামি উগ্রপন্থী বস্নগার শফিউর রহমান ফারাবী হত্যাকা-ে সরাসরি জড়িত না থাকলেও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে অভিজিৎ রায়কে ‘হত্যার প্ররোচনা দিয়েছিলেন’ বলে তাকে এ মামলায় আসামি করা হয়। আদালত বলেছে, ফারাবীকে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ এর ৬(২), ৮(আ) ধরায় সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- দেয়াই সমীচীন হবে।

২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(১)(ক)(অ) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি সত্তা বা বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশের অখ-তা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য জনসাধারণ বা জনসাধারণের কোনো অংশের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার বা কোনো সত্তা বা কোনো ব্যক্তিকে কোনো কাজ করতে বা করা থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে অন্য কোনো ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ করে বা করার চেষ্টা করে, তাহলে তিনি মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত হবেন এবং অর্থদ- আরোপ করা যাবে।

একই আইনের ৬(১)(ক)(আ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর জখম, আটক বা অপহরণ করার জন্য ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত করলে যাবজ্জীবন কারাদ- বা ৪ থেকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদ- এবং অর্থদ- দেয়া যাবে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি মামলাটির যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে রায় ঘোষণার এদিন ঠিক করেন। এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি আদালতে আত্মপক্ষ শুনানিতে আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণে আসা অভিযোগ পড়ে শোনালে কারাগারে থাকা চার আসামি নিজেদের নির্দোষ দাবি করে। তারও আগে রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে এ মামলার অভিযোগ প্রমাণের জন্য চার্জশিটের ৩৪ জন সাক্ষীর মধ্যে অভিজিতের বাবা অধ্যাপক ড. অজয় রায়সহ ২৮ জনের সাক্ষ্য উপস্থাপন করেন। মামলায় ২০১৯ সালের ১ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। ২০১৯ সালের ১৩ মার্চ তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পুলিশ ইন্সপেক্টর মুহাম্মাদ মনিরুল ইসলাম ৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিভিন্ন ধারায় এ চার্জশিট দাখিল করা হয়, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-।

চার্জশিটে বলা হয়, ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে অপপ্রচার ও মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি করায় জঙ্গি গ্রুপ আনসার আল ইসলামের নেতা মেজর জিয়ার নির্দেশ ও পরিকল্পনা এবং শারীরিক প্রশিক্ষক সেলিমের উপস্থিতিতে সংগঠনটির সদস্যরা অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যার দুদিন আগে থেকে জঙ্গি সায়মন, সোহেল, আকরাম ও হাসান অভিজিৎ রায়ের গতিবিধি অনুসরণ করে। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে আরাফাত, খলিল ওরফে আলী, অন্তু ও অনিক হত্যাকা-ে অংশ নেয়। হত্যাকা-ের সময় মেজর জিয়া, শরীরচর্চা প্রশিক্ষক সেলিম ঘটনাস্থল ঘিরে রাখেন যাতে তাদের সহযোগীদের কেউ আটক করতে না পারে। হত্যাকা-ের পর তারা ঘটনাস্থলে ব্যবহৃত চাপাতি ফেলে পালিয়ে যান।

২০১৫ সালে একুশে বইমেলায় অংশ নিতে দেশে এসেছিলেন। অভিজিৎ রায় ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নিয়ে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে জঙ্গি কায়দায় হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন অভিজিৎ রায়। চাপাতির আঘাতে আঙুল হারান তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। ওই ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর একের পর এক হামলা ও হত্যাকা-ের শিকার হতে থাকেন মুক্তমনা লেখক, বস্নগার, প্রকাশক ও অধিকারকর্মীরা। অভিজিৎ যুক্তরাষ্ট্রে সফটওয়্যার প্রকৌশলী ছিলেন এবং বন্যা চিকিৎসক। ঘটনার পরদিন অভিজিতের বাবা অজয় রায় শাহবাগ থানায় এ হত্যা মামলা করেন।

 

 

Check Also

ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের মেয়াদ বাড়লো

ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের মেয়াদ বাড়লো

বেনাপোল স্থলবন্দর ভারতের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে দেশটির সঙ্গে স্থলসীমান্ত বন্ধের মেয়াদ আরও ১৪ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *