Thursday , December 2 2021
Breaking News
Home / বাংলাদেশ / অপরাধ / গোপালগঞ্জের মাদ্রাসার কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ

গোপালগঞ্জের মাদ্রাসার কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ

স্টাফ রিপোর্টার : গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার পোনা আরাবিয়া শামচুল উলুম কওমিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে মুহাতামিম হাফেজ মো. মুছার বিরুদ্ধে। অভিযোগ তদন্তে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের ভেটেরিনারি সার্জনকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করলেও কার্যক্রম থেমে গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপনচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী পোনা মাদ্রাসা এবং এতিমখানার নামে আদায়কৃত সাহায্যের সিংহভাগ বছরের পর বছর আত্মসাৎ করে চলেছেন হাফেজ মো. মুছা। কোরবানির চামড়, যাকাত, ফেতরা, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদান এবং সরকারি ত্রাণের চালসহ লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে চলেছেন গত ৪০ বছর ধরে। এ অর্থে তিনি এখন অর্ধশত কোটি টাকার মালিক হয়ে ধরাকে সরা মনে করছেন। কাশিয়ানী এবং তার পৈত্রিক এলাকা নগরকান্দায় অন্তত ২০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক তিনি। কাশিয়ানী থানা সদরের ৩৫ নম্বর পোনা মৌজায় তিনি প্রায় ৩৫ বিঘা জমি কিনেছেন। কাশিয়ানী মৌজায় আছে তার তিনটি প্রাসাদোপম বাড়ি। এ সম্পত্তির বাজার মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

কাশিয়ানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবেও আছে তার এবং ছেলের নামে মোটা অংকের অর্থ। তবে মজার ব্যাপার মুসা কোনো আয়কর দেননি কোনো দিন। ভুয়া ভাউচার এবং বিলের মাধ্যমে এতিমের টাকা লুণ্ঠন এবং মাদ্রাসায় জঙ্গিবাদের প্রশিক্ষণের খবর প্রকাশের পর গণবিক্ষোভের মুখে তাকে এলাকা ছাড়তে হয়েছিল। জঙ্গি মনোভাপন্ন মুছা এতিমখানার লুটের টাকায় বিভিন্ন ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে মাদ্রাসায় অনুপ্রবেশের সুযোগে ফের অপকর্মে মেতে উঠেছেন। এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। মাদ্রাসায় চাকরির পর একজন এতিম ছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার পর তার সন্ত্রাসী চরিত্রের প্রকাশ ঘটে। তার দাপটে নিহতের মা আপোস করতে বাধ্য হন।

গহরডাঙ্গা মাদ্রাসার ছাত্র মুসা ১৯৬৬ সালে কাশিয়ানীতে পৌঁছে আস্তানা গাড়েন। ১৯৭১ সালে পোনা আরাবিয়া শামচুল উলুম কওমিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানায় চাকরি লাভের ফলে তার হাতে আলাদ্বীনের চেরাগ উঠে। শুরু থেকে গত প্রায় চারযুগ ধরে মুহাতামিম আছেন হাফেজ মো. মুছা। এ সময় মাদ্রাসার আয় ব্যয়ের হিসাব কাউকে দেননি। এ মাদ্রাসার একজন এতিম ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার পর তিনি এলাকায় জঙ্গি সমস্যা হিসেবে পরিচিতি পান। কৌশলী এ ব্যক্তি এরাকায় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ মাফিয়াগোষ্ঠী গড়ে তোলেন। তাদের নানা সুবিধা প্রদান এবং অন্যদের ভয়ভীতি দেখিয়েই মাফিয়া সাম্রাজ্য অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এদিকে মুসার সিরিজ দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য একের পর এক প্রকাশ পাওয়ায় এলাকার লোকজন বিক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন। মুসার অপকর্ম ফাঁস হয়ে পড়ায় বিক্ষুব্ধ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে পোনা মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি মো. বাকলেচুর রহমানসহ এলাকার বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্সকর্তার নিকট অভিযোগ দাখিল করেছেন। তবে অভিযোগের শুনানিতেই বিপত্তি ঘটেছে মুসার অপকর্মের প্রত্যক্ষদর্শী একজন সাবেক শিক্ষককে অপহরণের পরও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায়।

তবে জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করে মূর্তিমান আতংক হাফেজ মুছার হুমকিতে প্রতিবাদকারীরাই এখন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন। একজন প্রতিবাদী শিক্ষককে অপহরণ ও প্রাণনাশের হুমকির পরও প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেয়ায় এলাকায় আতংক বিরাজ করছে। অন্যান্য প্রতিবাদকারীরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে তাদের পিটিয়ে হেদায়েত করা ছাড়াও বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে সর্বস্বান্ত করার হুমকি অব্যাহত রেখেছেন হাফেজ মুছা এবং তার পক্ষাবলম্বনকারী চিহ্নিত কিছু লোকজন। ধুরন্ধর মুসা অপকর্ম জায়েজ করতে কমিটির মধ্যে বিরোধ বাধিয়ে রাখেন কূটকৌশলে। কমিটি ভেঙে দিয়ে পকেট কমিটি গঠনে তিনি পারঙ্গম।

মুসার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসক কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। নির্বাহী কর্মকর্তা এ,এস,এম, মাঈন উদ্দিন গত ১১ মার্চ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের ভেটেরিনারি সার্জন শঙ্কর কুমার দে কে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন : উপজেলা সমাজসেবা অফিসার এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার। ১৫ এপ্রিলের মধ্যে তাদের মতামতসহ প্রতিবেদন দাখিলের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। তবে এখনও তারা প্রতিবেদন দাখিল করেননি।

দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পোনা মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি বাকলেচুর রহমানসহ এলাকার বিশিষ্ট ছয় ব্যক্তি গত ৫ ফেব্রুয়ারি হাফেজ মুছার বিরুদ্ধে মাদ্রাসা ও এতিমখানার সরকারি দানের টাকাসহ সরকারি খয়রাতি চাল আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে বলা হয় : পোনা মাদ্রাসায় চাকরির শুরু থেকে একচেটিয়াভাবে হাফেজ মুসা জালিয়াতি করে এতিমের ধন লুণ্ঠনযজ্ঞে মেতেছেন। ভুয়া বিল ভাউচারের খরচ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং ক্যাশ বইয়ের সঙ্গে আয় ব্যয়ের মিল নেই। ব্যাংক হিসাব থেকে একতিয়ারবহির্ভূতভবে লাখ লাখ টাকা উঠিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে লোন দেয়ার নামে আত্মসাৎ করেছেন মুছা।

অপরদিকে মাদ্রাসার আয় ব্যয়ের অডিট করানো হয় না। গত ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত রশিদ বই এবং ক্যাশ বই যাচাইসহ অডিট করলে পিলে চমকানো দুর্নীতির প্রমাণ মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এ অভিযোগ আমলে নিয়ে দুদক তদন্ত এবং মুছা ও তার পোষ্যদের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিগগিরই তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে বলে দুদক সচিব জানিয়েছেন। গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসক এবং কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট মুছার বিরুদ্ধে দাখিলকৃত অভিযোগ তদন্ত না করা এবং অভিযোগকারীকে উল্টো অপহরণ প্রচেষ্ঠার কারণ তদন্ত করা হবে বলে সচিব মন্তব্য করেছেন।

এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোনা মাদ্রাসার জমি অধিগ্রহণ করে ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা প্রদান করেছে। মাদ্রাসার অবশিষ্ট জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি। রেল কর্তৃপক্ষ যে কোনো সময় এ জমির দখল নিলে প্রায় ৪০০ এতিমকে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হবে। হাফেজ মুসা ব্যক্তিগত লাভের কথা বিবেচনা করেই কাশিয়ানী বাজারে ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে মাদ্রাসার নামে ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ জমি কিনেছেন। জমির অর্থ আদান প্রদানের আড়ালে তিনি মোটা অংকের বাণিজ্য করেছেন বলে সন্দেহ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

Check Also

গাংনীতে ভূঁয়া এনএসআই আটক

আমিরুল ইসলাম অল্ডাম  : মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার গাঁড়াডোব গ্রাম থেকে থেকে নূরুল আমিন (৪০) নামের ভূঁয়া …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *