Saturday , May 8 2021
Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / জাতিসংঘ / মায়ানমার সীমান্তে মৃত্যুফাঁদ স্থলমাইন বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে মানবদেহ

মায়ানমার সীমান্তে মৃত্যুফাঁদ স্থলমাইন বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে মানবদেহ

 

মায়ানমার সীমান্তে

চট্টগ্রাম থেকে মশিউর রহমান রুবেল : মায়ানমার সীমান্তে নতুন আতঙ্ক এখন মাইন। প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের কোথাও না কোথাও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে এ দু’প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত এলাকা। বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে মানবদেহ। বেশিরভাগ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে মায়ানমার সীমান্ত ও নো-ম্যান্স ল্যান্ডে। অনেক ছিন্নভিন্ন দেহ পড়ে থাকতে দেখেছে মৃত্যু দুয়ার থেকে ফিরে আসা গুরুতর আহতরা। আর স্থলমাইন বিস্ফোরণের শিকার হয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও চিরতরে পঙ্গুত্বকে বরণ করতে হচ্ছে রোহিঙ্গা এসব নর-নারী, তরুণ ও যুবকদের।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ও বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো পয়েন্টে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা ফের রাখাইন রাজ্যে আর যাতে ফিরে যেতে না পারে সেজন্য স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে মায়ানমার সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গা নাগরিকরা হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলেও সীমান্তে এসে অসতর্কতার কারণে স্থলমাইন বিস্ফোরণের শিকার হচ্ছে। বড় ভাই মো. খলিলুল্লাহকে খুঁজতে গিয়ে মায়ানমার সীমান্তের বোতল্লাপাড়া এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে ১৯ বছর বয়সী মামুনুর রশীদ আজ মৃত্যুপ্রহর গুণছেন।

সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডের কাছে ছিন্নভিন্ন কয়েকটি দেহ পড়ে থাকতে দেখে ছুটে যান মামুন। আর এই সময় স্থলমাইন বিস্ফোরণে তার ডান হাতের কব্জি ও ২ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। বিস্ফোরিত স্থলমাইনের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত তার ২টি চোখ।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফ্লোরে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন মামুন।

হাসপাতালে যন্ত্রণায় কাতর মামুন গতকাল শুক্রবার দৈনিক জনতাকে জানান, তার ভাই খলিলুল্লাহ মায়ানমার সেনাবাহিনীর পুঁতা স্থলমাইন বিস্ফোরণে মারা গেছেন। ঐ স্থানে ছিন্নভিন্ন দেহগুলোর মধ্যে ভাইয়ের দেহ দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু তা আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি তার। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা মামুনের ছিন্ন ভিন্ন ২টি পা কেটে ফেলেছেন। তবে আদৌ মামুন চোখে দেখতে পারবে কিনা এ বিষয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা যথেষ্ট সন্দিহান।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শুধু মামুনই নয়, ২২ বছর বয়সী হোসেন জোহা, ২৫ বছর বয়সী ইউসুফ নবী, ২৬ বছরের মোহাম্মদ হোসেনও মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে কারও হাত কারও পা ইতোমধ্যেই কেটে ফেলা হয়েছে।

অন্যদিকে মাইন বিস্ফোরণে মায়ানমারের মাঙ্গালা গ্রামের নাওয়াজ শরীফ পুরো শরীর ঝলসে গেছে। ১৮ বছর বয়সী এই যুবকের ভেঙে গেছে ডান পায়ের কয়েকটি হাড়। ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ। ছেলের ঝলসে যাওয়া শরীরের পাশে বসেই বাবা হারুনুর রশীদ জানান, গত ৩০ আগস্ট মায়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসার সময় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসময় বিস্ফোরণে আরও ২ জন গুরুতর আহত হয় তবে তারা কোন হাসপাতালে রয়েছে তা জানাতে পারেননি।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১ সপ্তাহে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সীমান্তে ১ জন বাংলাদেশি ও ৩ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়। গুরুতর আহত হয়েছে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাসহ ৬ জন। তারা কঙ্বাজার ও চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন।

২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে শুরু হওয়া মায়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতন ও নিধন অভিযান থেকে বাঁচতে নাইক্ষ্যংছড়িসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার বেশ কিছু পয়েন্টের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নেয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টায় সীমান্তের ওপারে পাহাড়ের বিভিন্ন জঙ্গলে লুকিয়ে আছে তারা।

জিরো পয়েন্টে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে আর যাতে ফিরে যেতে না পারে সে জন্য নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের তুমব্রু, বাইশারি, আশারতলি, চাকঢালা, সাপমারাঝিরি, লেমুছড়ি সীমান্তসহ ৭টি পয়েন্টে স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে মায়ানমার সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গা নাগরিকরা হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিলেও সীমান্তে এসে অসতর্কতার কারণে স্থলমাইন বিস্ফোরণের শিকার হচ্ছে। ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাংলাদেশি হাকিমউল্লাহর দেহ (৪৫) মাইন বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়ে সীমান্তের সাপমারাঝিরির ক্যাম্পে মারা যান মায়ানমারের ছালিদং এলাকার বাসিন্দা আবদুুল কাসিমের স্ত্রী গোল ছেহের (৬০)।

১১ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে ৪৪ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে মাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গা কৃষক ছৈয়দ আহমদ (৫৫)। একই দিন রাত সাড়ে ১১টায় ৪৫ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে মায়ানমারের ফকিরাবাজার এলাকার বাসিন্দা মোক্তার আহমদ (৪৫) নিহত হন। এছাড়াও মাইন বিস্ফোরণে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে প্রায়শই।

স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টার দিকে ৩১ নম্বর সীমান্ত পিলার এলাকার রায়বুনিয়া দিয়ে অনুপ্রবেশকালে মাইন বিস্ফোরণে সাবেকুন্নাহার (৪৫) আহত হয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টার দিকে ৩৪ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছ দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় ১০ বছর বয়সী কায়সার ও ৭ বছর বয়সী মো. আলম আহত হয়।

গত ১০ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর সীমান্ত পিলারের মধ্যবর্তী স্থানে মাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশি যুবক মো. হাসান (৩২) গুরুতর আহত হয়। তার ১টি পা উড়ে যায় এবং চোখেও আঘাত লাগে। ১১ সেপ্টেম্বর আয়েশা আক্তার নামে এক রোহিঙ্গা মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়। ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে চাকঢালা সীমান্তে রোহিঙ্গা আবদুল কাদের (৪৮) মাইন বিস্ফোরণে ডান চোখে আঘাত পেয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।

নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তসলিম ইকবাল জানান, আশারতলি চাকঢালা সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে এক বাংলাদেশিসহ ৪ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র আশারতলী চাকঢালা সীমান্তের একটি পয়েন্টের। এমন বেশকিছু পয়েন্ট প্রতিনিয়ত এ রকম বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে যেসব মৃতদেহগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে সেগুলো উদ্ধার বা সৎকারের ব্যবস্থা না করায় সীমান্ত এলাকায় লাশের গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। এমনটাই জানিয়েছেন হাসপাতালে আসা আহতদের অনেকেই।

প্রসঙ্গত, মায়ানমার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে।

Check Also

খুলনায় স্বাস্থ্যবি‌ধি ভু‌লে চলছে গায়ে গা লাগিয়ে কেনাকাটা

খুলনায় স্বাস্থ্যবি‌ধি ভু‌লে চলছে গায়ে গা লাগিয়ে কেনাকাটা

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা ব্যুরো:  মহামারী করোনা মানছে না মার্কেট গুলিতে বেশির ভাগ সময় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *