Tuesday , May 11 2021
Breaking News
Home / খবর / আজ সেই ভয়াল ২৫ মার্চ

আজ সেই ভয়াল ২৫ মার্চ

 ষ্টাফরিপোটার : ২৫ মার্চ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক নৃশংস, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় কালরাত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত দিন। অন্য সব রাত থেকে বাঙালি জাতির ইতিহাসে এই রাতটি আলাদা। একাত্তরের অগি্নঝরা এদিনে বাঙালি জাতি তথা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল ইতিহাসের নৃশংসতম বর্বরতা। কারণ এই রাতের মধ্যদিয়েই শুরু হয় আমাদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের এই অভিযানে পাকিবাহিনী নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা করে। তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পথের শিশুরাও।

এই রাত একদিকে যেমন বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম মুহূর্তটি প্রত্যক্ষ করেছিল, তেমনি অন্যদিকে এ রাতেই সূচিত হয়েছিল ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা। এই রাত থেকে পরবর্তী ন’মাসে স্বাধীনতার জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল ৩০ লাখ মানুষকে। এই হত্যাযজ্ঞে নরপশু পাকসেনাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তাদের এদেশীয় দোসর ঘাতক দালাল রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীর সদস্যরা। স্বাধীনতার জন্য সম্ভ্রম হারাতে হয়েছিল অসংখ্য মা-বোনকে। মাত্র ন’মাসে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যা ও নারী নিগ্রহের নজির বিশ্ব ইতিহাসে আর নেই। স্তম্ভিত বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে বর্বর পাকসেনাদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ।

দেশজুড়ে সে সময় চলছিল অসহযোগ আন্দোলন। সবার মুখে কেবল একটিই সস্নোগান ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা মেঘনা, তোমার আমার ঠিকানা’ এবং ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’

২২ মার্চ রাতে বিভিন্ন সংগঠনের ছাত্রনেতাদের মধ্যে জহুরুল হক হলে এক জরুরি সভা হয়। পরদিন সকালে সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ প্রমুখ ছাত্রনেতা একত্রিত হন। পাকিস্তানি অপারেশন সার্চ লাইটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল জহুরুল হক হল। সৌভাগ্যবশত ২৫ মার্চ মধ্যরাতের আগে প্রায় সব ছাত্রনেতা ও কর্মী হল ছেড়ে চলে যান। ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনী ট্যাংক, জিপে বসানো রিকয়েললেস রাইফেল, মর্টার, ভারী ও হাল্কা মেশিনগান, রকেট লঞ্চার এবং চাইনিজ অটোমেটিক রাইফেল প্রভৃতি মরণাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে চারদিক থেকে জহুরুল হক হল আক্রমণ করে। দৈনিক আজাদ পত্রিকার ১৯৭২ সালের ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় এ তথ্য প্রকাশিত হয়।

‘অপারেশন সার্চ লাইটের’ মূল লক্ষ্য ছিল পিলখানা ইপিআর হেডকোয়ার্টার, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম, নিউমার্কেট, ঠাটারি বাজার, পুরান ঢাকা, ফরাশগঞ্জ, বিকে দাস লেন, শাঁখারী বাজার, তাঁতী বাজার, ভোলা গিরি আশ্রম, অভয়দাশ লেন, টিকাটুলি, হাটখোলা, আরকে মিশন রোড, গে-ারিয়া সাধনা ঔষধালয়সহ বিভিন্ন এলাকা। সংবাদপত্র অফিসের মধ্যে লক্ষ্য ছিল ‘পিপলস অফিস, ইত্তেফাক ও সংবাদ।’ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সে রাতে পাকিস্তানিরা কমপক্ষে ১০ হাজার সাধারণ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। যার মধ্যে ছিল রাজারবাগ পুলিশ স্টেশনের ৫ শতাধিক পুলিশ ও ৩ শতাধিক নিরীহ শিক্ষার্থী।

মধ্যরাতে পাক বাহিনীর ট্যাঙ্কগুলো কামান উঁচিয়ে ঢুকে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সঙ্গে লরিবোঝাই সৈন্য। প্রথমে তারা গুলি চালায় ইকবাল হলে। এতে মারা যান শতাধিক ছাত্র। এরপর জগন্নাথ হলে ঢুকে সাব-মেশিনগান দিয়ে গুলি করে হত্যা করে আরও দেড় শতাধিক ছাত্র-শিক্ষককে। রোকেয়া হলও আক্রমণ থেকে বাদ যায়নি। গুলি চালিয়ে তারা হত্যা করে অনেক ছাত্রীকে। কেউ কেউ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচায়। মেডিকেল কলেজ এবং হোস্টেলেও গুলি করে অনেক নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে হায়েনার দল।

এসব ঘটনা যখন ঘটছিল, তখন সেনাবাহিনীর কয়েকটি ইউনিট শেখ মুজিবের বাড়ি ঘিরে ফেলে। রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে একটি ট্যাঙ্ক, একটি সাঁজোয়া গাড়ি এবং কয়েকটি ট্রাকবোঝাই সৈন্য শেখ মুজিবের বাড়ির ওপর দিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসে। তারা বাসার সামনে আসার পর একজন অফিসার ইংরেজিতে বলেন, ‘শেখ, আপনি নেমে আসুন।’ শেখ মুজিব তার বেলকনিতে বেরিয়ে এসে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি প্রস্তুত তবে গুলি ছোঁড়ার দরকার ছিল না। আপনারা আমাকে টেলিফোন করে তারপর আসতে পারতেন।’ এরপর অফিসারটি ভেতরে ঢুকে শেখ মুজিবকে বললেন, ‘আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।’ ভোর ৫টার পর পাকবাহিনী গোলার আঘাতে উড়িয়ে দেয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।

সেদিন রাতে একযোগে জগন্নাথ হল ছাড়াও ইকবাল হল, রোকেয়া হল শকুনীর দল একে একে তছনছ করে দিয়েছিল। পাক জান্তার কালো থাবা থেকে রক্ষা পাননি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিভিন্ন বিভাগের নয় শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। হানাদাররা চলার পথে রাস্তার দুই পাশে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলে অসংখ্য নিরীহ, গরিব মানুষকে। মেডিকেল কলেজ ও ছাত্রাবাসে গোলার পর গোলা ছুড়ে হত্যা করা হয় অজস্র মানুষকে।

চারদিক রক্ত আর রক্ত, সারি সারি শহীদের লাশ। সেদিন হিংস্র শ্বাপদ পাকবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে রোকেয়া হলের ছাদ থেকে প্রায় ৫০ ছাত্রী লাফ দিয়ে পড়েছিল। নরপশুরা সেদিন হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণ, লুট, জ্বালাও-পোড়াও করেছিল শহরের সব জায়গায়। সেই রাতে রাজারবাগ পুলিশের সদরদফতরে পাকসেনাদের সাঁড়াশি অভিযানের মুখেও বাঙালি পুলিশ সদস্যরা আত্মসমর্পণের বদলে রাইফেল তাক করে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু শত্রুর ট্যাঙ্ক আর ভারি মেশিনগানের ক্রমাগত গুলির মুখে মুহূর্তেই গুড়িয়ে যায় সমস্ত ব্যারিকেড। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে আগুনে ভস্মীভূত করা হয় পুলিশের সদরদফতর। সে রাতে ১১শ বাঙালি পুলিশের রক্ত ঝরিয়েও তারা ক্ষান্ত হয়নি। গুড়িয়ে দিয়েছিল পুরো ব্যারাক, জ্বালিয়ে দিয়েছিল সবকিছু।

অন্যদিকে নগরজুড়েও রাতভর চলে বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ ও ধ্বংসের তা-ব। হকচকিত বাঙালি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে। দানবীয় বাহিনীর আক্রমণের বিভীষিকায় নিমজ্জিত হয় ঢাকা। কেঁদে ওঠে শহরের রাজপথ, অলিগলি, ফুটপাথ, খেলার মাঠ, ক্যাম্পাস। মানুষের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে আকাশ। সে কান্না ছাপিয়ে তখন আকাশে কেবলই মুহুর্মুহু আগুনের লেলিহান শিখা। চারদিকে কেবল প্রজ্বলিত অগি্নকা-, ধ্বংস আর মর্মন্তুদ চিৎকার। মধ্যরাতেই ঢাকা তখন লাশের শহর। দেশের বড় শহরগুলোতেও একইভাবে অতর্কিতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকসেনারা। অবশ্য এই পরিস্থিতিতেও বাঙালি ছাত্র-জনতা রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ঢাকার ফার্মগেট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চারপাশে সর্বত্র এই প্রতিরোধ ছিল। প্রতিরোধ ছিল চট্টগ্রামেও। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস ববর্রতার মুখে সেদিন কিছুই করতে পারেনি অকুতোভয় বাঙালি।

 

Check Also

মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে খুলনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন

মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে খুলনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন

খবর বিজ্ঞপ্তিঃ বি এম রাকিব হাসান, খুলনা ব্যুরো” মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে সাতক্ষীরা ডিবি পুলিশ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *