Tuesday , May 11 2021
Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / আজ বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের দিন

আজ বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের দিন

নাজমুল হক নাহিদ

প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন হয়ে আসছে মহান ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার এই দিবসটি। ১৯৪৭ সালে ভারতের সাথে দেশ ভাগের পর ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান ভিন্ন হওয়ার পরও শুধু মাত্র ধর্মীয় সংখ্যা গরিষ্ঠতার উপর ভিত্তি করে পূর্ব পাকিস্তান দুটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। জনসংখ্যার দিক দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান সংখ্যা লঘু হওয়ার পরও সিভিল সার্ভিস, মিলিটারী ও গুরুত্বপূর্ণ সব রাষ্ট্রিয় পদে তাদের আধিপত্য বেশি ছিল। ক্রমে তারা নিজেদের শাসনকর্তা ও বাঙালিদের প্রজা ভাবতে শুরু করলেন। নব গঠিত রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তারা উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করতে থাকেন। এই পরিকল্পনার কথা জানতে পারে ঢাকায় তমদ্দুন মজলিশের সেক্রেটারী অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে এক প্রতিবাদ সভা ও রালি বের করা হয় এবং সভায় বাংলাকে উর্দুও পাশাপাশি রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি করা হয়। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ এর ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। তারপর তাদের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে।

পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন আত্মকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের কারণে আবারও সোচ্চার হয়ে উঠে বাঙালি। ফলে ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে পুনরায় মিছিল করা হয়। এতে শেখ মুজিবর রহমান, কাজী গোলাম মাহাবুব, অলি আহাদ, শওকত আলী, সামসুল হক প্রমুখ গ্রেফতার হন। তারপর ২১ মার্চ ১৯৪৮ সালে ঢাকার রেস কোর্স ময়দানে তৎকালিন গভর্ণর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দৃঢ় ভাষায় ঘোষণা করেন উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। আবারো সোচ্চার হয়ে ওঠে বাঙালি, এমন সিদ্ধান্ত কখনো মানবো না এই দাবি ওঠে সারাবাংলায়। এভাবে ৪ বছর অতিবাহিত হয় তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র থামে না। ১৯৫২ সাল পাকিস্তানের নব নিযুক্ত গভর্ণর জেনারেল খাজানাজিমউদ্দিন ঢাকায় এসে পুনরায় ঘোষণা দেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণা শোনার পর গর্জে ওঠে বাঙালি জাতি, প্রতিবাদে জ্বলে ওঠে সারাবাংলা। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল ৮ ফাল্গুন ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ সকাল ৯টা হতে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে জড়ো হতে থাকে ছাত্র জনতা। পাকিস্তান সরকার ঐ দিন ১৪৪ ধারা জারি করেন। এক সময় সমাবেত ছাত্র জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। পুলিশ মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রফিক, জব্বার, ছালাম, ও বরকতসহ নাম না জানা অনেকে।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মায়ের মুখের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এ দেশের দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক রাষ্ট্রভাষা বাংলা হিসেবে উর্দুকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে সেদিন এ দেশের দামাল ছেলেরা তাদের জীবনের বিনিময়ে ঢাকার রাজপথে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনা করেছিল। বাংলাদেশ আজ সার্বভৌম একটি দেশ। আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন এই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ও জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার পণ্ডাতে আছে সমৃদ্ধ এক ইতিহাস। যুগে যুগে নানা আন্দোলন, বিপ্লব-বিদ্রোহ আর মতাদর্শের বিকাশ হতে হতে আমরা এসে পৌঁছেছি আজকের বাংলায়। বাঙালির বীরত্ব আর সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। মায়ের ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের সুমহান প্রেরণার পথ ধরে বাঙালি জাতি এগিয়ে এসেছে মুক্তির পথে-স্বাধীনতার পথে। বাঙালি জাতি তাদের গৌরবের মহিমায় জয় করে নেয় স্বাধীনতা। শত্রুর অসুরিক আচরণ, বিকট উল্লাস আর নৃশংসতা স্বল্পসময়ে পরাভূত করা সম্ভব হয়, এ দেশের মানুষের মনে কাব্যময় সি্নগ্ধতার সঙ্গে সাহসের ইষ্পাত দৃঢ়তা ছিল বলেই। মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালির প্রেরণার একমাত্র বাতিঘর ছিল অনাদি অতীতের সংগ্রাম আর ভাষার জন্য রক্তদানের ইতিহাস। বহিরাগত বর্ণনাতীত হাজারো নির্যাতন-নিপীড়ন, আক্রমণ-ষড়যন্ত্র পেরিয়ে হাজারো বছর ধরে অভিন্ন সত্তায় আমরা বাঙালি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সেই আত্মিক সম্পর্কের বন্ধনগত উপলব্ধির মধ্যদিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্বপ্নের এই সোনার বাংলাদেশ। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি যারা মাতৃভাষার জন্য অকপটে নিজেদের বুকে গুলি তুলে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি এবং জীবন-পণ যুদ্ধ করে আমাদের জন্য এই মহান মাতৃভাষার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সেই সব স্মরণীয়-বরণীয় রফিক, বরকত, জব্বার, সালাম, শফিউরসহ নাম না জানা আরো অনেক ভাইয়ের এবং বাংলাভাষার সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী পরলোকগত ও এখনো জীবিত সকল নেতাকর্মীদের আত্মদানের কথা। আমরা বাঙালি জাতি তাদের কাছে চিরঋণী। তাই তো আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাত ফেরিতে এক সাথে গেয়ে ওঠি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? তাদের এই ঋণ তখনই শোধ হবে যে দিন বাংলাদেশকে আমরা সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে পারবো। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১- এর ২৪ বছর মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করাসহ স্বাধীনতার জন্য অনেক বাধা-বিপত্তি, যন্ত্রণা সহ্য করেছে আমাদের ৩০ লাখ শহীদ, অসংখ্য মা-বাবা, ভাই-বোন, বুদ্ধিজীবী এমনকি হাজারো শিশু। তাদের এই অকল্পনীয় ত্যাগ স্বীকার শুধুমাত্র স্বাধীনতা আর মুক্ত ভাষায় কথা বলার জন্য। সন্মান নিয়ে নিজের পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাঙালি জাতির ঐতিহ্যেও প্রথম নিদর্শন। ভাষা আন্দলন থেকেই মুক্তিযুদ্ধ। আর এই ভাষার অধিকার এবং নায্য অধিকার আদায়ে বাঙালির সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে রক্তস্নাত হয়েছে বাংলার সবুজ-শ্যামল নিষ্পাপ ভ্থমি। ‘আমি বাংলায় কথা কই, আমি বাংলার কথা কই/ আমি বাংলায় হাসি, বাংলায় ভাসি, বাংলায় জেগে রই/ বাংলা আমার তৃষ্ণার জল, দৃপ্ত শেষ চুমুক/ আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ। আমরি বাংলা ভাষা, আমরা এ ভাষাতে মা কে ডাকি, এ ভাষাতেই স্বপ্ন আঁকি। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকারের জন্য এদেশের মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে ঢাকার রাজপথ। আর তাই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জন্য শুধু একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, আত্মপ্রকাশের মহাবিস্ফোরণও। সেই রাষ্ট্রভাষার পথ ধরেই সূচিত হয় স্বাধীনতার আন্দোলন। গনতন্ত্রই স্বাধীনতার কথা বলে। বাংলাদেশ গণতন্ত্র অধিকারের দেশ। এর মধ্যে রয়েছে, বাক-স্বাধীনতা, মতো প্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, শেখার বা জানার স্বাধীনতা, কর্ম ও পেশার স্বাধীনতা, বলার স্বাধীনতা, মানবীয় অধিকার ভোগের স্বাধীনতা। এমনকি গণতন্ত্রের মূল কথা হচ্ছে জনগণের স্বার্থ, জনগণের সেবা, জনগণের সরকার। জনগণের এই স্বার্থ ও সেবায় কোনো বৈষম্য থাকবে না। থাকবে না কোথাও কোনো নিপীড়ন-নির্যাতন। গণতন্ত্র মানুষের অধিকারের কথা বলে। এর মধ্যে রয়েছে- বেঁচে থাকার অধিকার, জীবন- সম্পদের নিরাপত্তা লাভের অধিকার, সম-মর্যাদা লাভের অধিকার, নিপীড়ন- নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভের অধিকার, ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার। যা আমরা এখন হারাতে বসেছি। বলা চলে, মায়ের ভাষার যে সংগ্রাম আমাদেরকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করিয়েছে, তাকে পূর্ণতা দানের কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক ও আত্মপ্রকাশের দিন।

Check Also

মোল্লাহাটে ৩৩৩-এ খবর পেয়ে খাদ্য সামগ্রী পৌছে দিলেন ইউএনও

মিয়া পারভেজ আলম  (বাগেরহাট) প্রতিনিধি ঃ  বাগেরহাটের মোল্লাহাটে ৩৩৩-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে অসহায় দুস’ ৫’টি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *