Saturday , January 16 2021
Breaking News
Home / বাংলাদেশ / নতুন স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ

নতুন স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ

images

 সাগরের অজস্র জলরাশি ও এর তলদেশের বিশাল সম্পদকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণে এক অর্থনৈতিক বিপ্লব। ২০১৩ সালে মায়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পর এই সম্ভাবনা আরো প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশর স্থলভাগের সম্পদ ক্রমশ হরাস পাওয়ার পাশাপাশি কমছে জমির পরিমাণ। তাই নতুন সম্পদের খোঁজ করা এখন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। সামপ্রতিক সময়ে সমুদ্রসীমার বিরোধ মীমাংসা হওয়ার পর সমুদ্রসীমায় সম্পদ আহরণের বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ মহাপরিকল্পনায় সমুদ্র অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। সমুদ্র ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে দেশ। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সমুদ্র সম্পদ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখবে। সমুদ্র সম্পদের যথাযথ ব্যবহারে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুই ডিজিটে উন্নীত করা সম্ভব। কিন্তু এজন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের মধ্যদিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হবে। সমুদ্র জয়ের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদের যে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, তার সঠিক ও যথাযথ ব্যবহারটাই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী বস্নু ইকোনমির আধুনিক সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সমুদ্রে যে পানি আছে এবং এর তলদেশে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, সেসব সম্পদ যদি আমরা টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করি তবে তাকে বস্নু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি বলে। ভারত মহাসাগরের ব-দ্বীপ বাংলাদেশের জন্য বস্নু ইকোনমি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বঙ্গবন্ধুর পথনির্দেশনায় আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের (পিসিএ) রায়ে মায়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ মিটিয়ে বঙ্গোপসাগরের বিশাল এলাকার ওপর বাংলাদেশের অধিকার সুরক্ষিত হয়েছে।
images
জানা যায়, ১৯৯৪ সালে অধ্যাপক গুন্টার পাউলি ভবিষ্যতের অর্থনীতির রূপরেখা প্রণয়নের জন্য টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব মডেল হিসেবে বস্নু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির ধারণা দেন। পৃথিবীর দেশগুলো তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত চাহিদা মেটাতে তাকিয়ে আছে সমুদ্রবক্ষে সঞ্চিত সম্পদের দিকে। ২০১২ সালের রিও ডি জেনিরোতে টেকসই উন্নয়ন শীর্ষক জাতিসংঘ সম্মেলনে প্রথম উত্থাপিত হয় ‘বস্নু-ইকোনমি’। যেখানে নানান ধারণা দিয়ে বোঝানো হয়, আগামী দিনের জন্য একটি সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা।
নতুন স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশে সমুদ্র অ?র্থনীতিতে সম্ভাবনা কতটুকু, তা জানার আগে বাংলাদেশের সমুদ্র বিজয় কবে তা জানা যাক। বঙ্গোপসাগরের সীমানা নিয়ে মায়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধ চলে আসছিল দীর্ঘদিন। এ বিষয়ক আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ২০১২ সালে মায়ানমারের সাথে ও ২০১৪ সালে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। ঐতিহাসিক বিজয় শুধু এই বিশাল সমুদ্রসীমার ওপর ‘অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব’ স্থাপনের কৃতিত্ব নয়, বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরের একটি বিশাল এলাকার সমুদ্র সম্পদ আহরণের স্বর্ণ সুযোগও উপহার দিয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, এই বিজয় অর্জনের ছয় বছর অতিক্রান্ত হলেও যথাযথ অগ্রাধিকার দিয়ে আজো এই বিশাল সমুদ্রসীমা থেকে সম্পদ আহরণ জোরদার করা যায়নি।

বাংলাদেশের স্থলভাগের আয়তন যেখানে মাত্র ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারের সামান্য বেশি, সেখানে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার ওপর অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অর্জন যে আমাদের কত বড় সৌভাগ্য, তা কি আমরা উপলব্ধি করতে পারছি? ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল। আর চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের সম্পদের ওপর পূর্ণ অধিকার। এই সুবিশাল জলরাশির ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের সমুদ্র বা নীল অর্থনীতির এক অপার সম্ভাবনা। জানা যায়, আন্তর্জাতিক সমুদ্র সম্পদ গবেষকরা বহুকাল আগে থেকেই বঙ্গোপসাগরকে বিভিন্ন ধরনের সম্পদের খনি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে যে খনিজ সম্পদ রয়েছে তা পৃথিবীর আর কোনো সাগর, উপসাগরে নেই বলেও ধারণা অনেকের। আরো বহু বছর আগে মণি, মুক্তা, সোনা, রূপা, তামা, প্রবালসহ বিভিন্ন ধরনের মহামূল্যবান ধনরত্ন এখানে রয়েছে ধারণা করে, ভারতবর্ষের পৌরাণিকে বঙ্গোপসাগরের নাম দেয়া হয়েছিল ‘রত্নাকাগার’। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র সম্পদকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। অপ্রাণিজ সমুদ্র সম্পদ ও প্রাণিজ সমুদ্র সম্পদ। অপ্রাণিজ সমুদ্র সম্পদ বলতে মূলত খনিজ ও খনিজ জাতীয় সম্পদকে বোঝায়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তেল, গ্যাস, চুনাপাথর ইত্যাদি। খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৭ ধরনের খনিজ বালি। এর মধ্যে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় জিরকন, রুটাইল, সিলিমানাইট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গ্যানেট, কায়ানাইট, মোনাজাইট, লিকোক্সিন ইত্যাদি। যার প্রত্যেকটি পদার্থই মূল্যবান, তবে মোনাজাইট অতিমূল্যবান পদার্থ। এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ পারমাণবিক বোমা তৈরিতে ও পারমাণবিক চুলি্লতে শক্তি উৎপাদক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
নতুন স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের তথ্যমতে, দেশের সমুদ্র সৈকতের বালিতে মোট খনিজের মজুদ ৪৪ লাখ টন এবং প্রকৃত সমৃদ্ধ খনিজের পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন, যা বঙ্গোপসাগরের ১৩টি স্থানে পাওয়া গেছে। তাদের হিসেবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা থেকে প্রায় ১০ লাখ টন খনিজ বালু উত্তোলন করা যেতে পারে। এছাড়াও বঙ্গোপসাগরের তলদেশে রয়েছে ম্যাঙ্গানিজ নডিউল, ফসফরাস ডেপোজিট, পলিমেটালিক সালফাইড, অ্যাডাপোরাইট, ক্লেসার ডেপোজিট নামক আকরিক। এসব আকরিক পরিশোধনের মাধ্যমে পাওয়া যাবে মলিবডেনাম, কোবাল্ট, কপার, জিঙ্ক, লেডসহ ইত্যাদি দুর্লভ ধাতু। এসব ধাতু জাহাজ নির্মাণ ও রাসায়নিক কারখানায় ব্যবহার করা যাবে। বাংলাদেশ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী অগভীর সমুদ্রের তলদেশে ভ্যানাডিয়াম, প্লাটিনাম, কোবাল্ট, মলিবডেনাম, ম্যাঙ্গানিজ ক্রাস্ট, তামা, সিসা, জিঙ্ক এবং কিছু পরিমাণ সোনা ও রূপা দিয়ে গঠিত সালফাইডের অস্তিত্ব রয়েছে। ১ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরে এসব মূল্যবান সম্পদ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের প্রায় ৩০ থেকে ৮০ মিটার গভীরে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ‘ ক্লে’র সন্ধান পাওয়া গেছে।
image_298584
এছাড়া সমপ্রতি বঙ্গোপসাগরের অগভীর ও গভীর তলদেশে মহামূল্যবান ধাতু ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আর বাংলাদেশের পাশেই প্রতিবেশী ভারত কৃষ্ণা গোধাবেরি বেসিনে ১০০ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কারের কথা জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংস্থা ওএনজিসি। এছাড়া বাংলাদেশের কাছাকাছি মায়ানমারের সাগর ভাগেও পাওয়া গেছে বড় গ্যাসক্ষেত্র।

এ কারণে ভূতত্ত্ববিদদের অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায়ও বড় ধরনের গ্যাসের মজুদ থাকতে পারে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি ওএনজিসির সাথে দুটি অগভীর বস্নকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে চুক্তি করেছে। তবে গতি ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। আর অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি সান্তোসের সাথে গভীর বস্নক ১১ ও দক্ষিণ কোরিয়ার পোস্কো-দাইয়ুর সাথে গভীর বস্নক ১২ এর জন্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। তবে তাদেরও দ্বি-মাত্রিক সিসমিক জরিপ ছাড়া তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

জানা যায়, মৎস্য সম্পদ, সামুদ্রিক প্রাণী, সামুদ্রিক আগাছা, লতা, গুল্মতেও ভরপুর বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় রয়েছে ৪টি মৎস্যক্ষেত্র। যেখানে প্রায় ৪৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাছাড়া আরো আছে ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ৭ প্রজাতির কচ্ছপ, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ৩ প্রজাতির তিমি, ১০ প্রজাতির ডলফিন, প্রায় ২০০ প্রজাতির সি উইড (এক ধরনের সামুদ্রিক ঘাস) রয়েছে বলেও মনে করেন অনেক গবেষক। কিন্তু ব?র্তমানে মাছ ধরতে বাংলাদেশের জেলেরা দেশি নৌযান নিয়ে মাত্র ২০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জেলেদের কাছে সমুদ্রসীমার বড় একটা অংশই অজানা। ৫০ কিলোমিটারের বেশি দূরে যাবার মতো মাছ ধরার কোনো নৌযানই নেই বাংলাদেশের। এই সমস্যার সমাধান করা নিশ্চয়ই কঠিন কিছু নয়। ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) সভাপতি এ কে এম হামিদ বলেন, বর্তমান বিশ্বে বস্নু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি বা সমুদ্র অর্থনীতিকে সম্ভাবনাময় বিকল্প অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ব্যাপারে সরকার কাজ করছে।
images
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, মহামারীর আক্রমণে করোনাভাইরাস বিশ্ব সভ্যতার অগ্রগতিতে স্থিরতা এসেছে এবং হতাশার ছায়া ফেলেছে। বিশ্ব বাণিজ্য একটি অনিশ্চিত অর্থনৈতিক অন্ধকার ও মন্দার পূর্বাভাস দিয়েছে। এই পরিপেক্ষিতে এখন সময় এসেছে যে আমরা সমুদ্র অর্থনীতির এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতের মহামারীটির সম্ভাব্য প্রভাবগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য ফিরে আসার উপায় খুঁজতে থাকি। মহামারী সংকট কাটিয়ে উঠতে বস্নু ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতি একটি বিশাল সম্ভাবনা হতে পারে।

 

Check Also

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন পেছাল ৭৭ বার

স্টাফ রিপোর্টার:  সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন গতকাল মঙ্গলবার ধার্য ছিল। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *