Monday , December 6 2021
Home / বাংলাদেশ / আইন ও বিচার / যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড

যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড

hycot

স্টাফ রিপোর্টার :  এক হত্যা মামলায় ‘যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস’ বলে আপিল বিভাগের মতামতের রায়টির পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করেছেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। গতকাল প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ভার্চ্যুয়াল আপিল বিভাগ যাবজ্জীবনের প্রাথমিক অর্থদণ্ডিতের বাকি জীবন এই অভিমত দিয়ে এক রিভিউ পিটিশন নিষ্পত্তি করে এ রায় ঘোষণা করেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গতকাল মঙ্গলবার বলেছেন, এখন থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ ৩০ বছর। তবে যদি কোনো আদালত রায়ে ‘আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’ উল্লেখ করে তাহলে আদালতের ওই রায় অনুযায়ী সাজা

কার্যকর হবে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চ ঘোষিত এ রায়ে বলেছেন, ২০১৭ সালের ফৌজদারি রিভিউ পিটিশন নং ৮২ অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে-‘প্রাথমিক অর্থে যাবজ্জীবন কারাবাস মানে কোনো দ-িতের স্বাভাবিক জীবনের বাকি পুরো জীবন’ এই সংক্ষিপ্ত আদেশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ‘যাবজ্জীবন সাজা তখনই ৩০ বছর বলে গণ্য হবে যখন ফৌজদারি কার্যবিধি ৩৫-এ এবং দ-বিধির ৪৫ ও ৫৩ এবং ৫৫ ও ৫৭ ধারা একসাথে পড়া হবে।’ ‘তবে আদালত, ট্রাইব্যুনাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাউকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী আমৃত্যু কারাদ- দিলে সেই দ-িত ব্যক্তি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫-এ ধারার সুবিধা পাবেন না।’ রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি এটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ। রিভিউ আবেদনের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

অ্যাডভোকেট শিশির মনির পরে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন সাজার অর্থ হবে ৩০ বছর কারাদ-। তবে কোনো নির্দিষ্ট আদালত বা ট্রাইব্যুনাল যদি কোনো ব্যক্তিকে আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদ-ের আদেশ দিয়ে থাকে সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি আদেশ থেকে কোনো সুবিধা পাবে না। গত ২৪ নভেম্বর যাবজ্জীবন সাজা নিয়ে পুনর্বিবেচনার আবেদনটির পুনঃশুনানি শেষে ১ ডিসেম্বর রায়ের জন্য দিন ধার্য করে আপিল বিভাগ। ১১ জুলাই পুনর্বিবেচনার আবেদনটির ওপর শুনানি শেষে তা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছিল আপিল বিভাগ, বলেন তিনি।
এটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, আপিল বিভাগ তাদের সংক্ষিপ্ত আদেশে বলেছেন যাবজ্জীবন বলতে ‘প্রাইমা ফেসি’ বোঝা যাচ্ছে যে সারাজীবনই হবে। আমৃত্যু হবে। তবে বিভিন্ন আইন, ধারা- উপধারা বিশ্লেষণ করে আদালত বলছেন যে এটা (যাবজ্জীবন) ৩০ বছর। তিনি বলেন, ধারাগুলো যদি বিশ্লেষণ করি, তাহলে ৩০ বছর। কিন্তু যদি কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কোনো মামলায় কারো যদি আমৃত্যু কারাদ- দেন, সে ক্ষেত্রে ৩০ বছরের বিধানটি হবে না। আমৃত্যু হবে। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বর্তমান আইনের বিধানে যাবজ্জীবন ৩০ বছর। কেননা ৩০ বছর যদি না হয়, আইনের অন্য বিধানগুলো যেমন ৩৫এ, জেলকোড সব বাতিল হয়ে যাবে। আজকের রায়ে আপিল বিভাগ বলেছেন, যদিও যাবজ্জীবন বলতে একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবন যতদিন ততদিন। কিন্তু আইনের বিধান অনুযায়ী একজন যাবজ্জীবন আসামির সাজা ৩০ বছর ভোগ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আইনের অন্যান্য রেয়াত যেগুলো আছে, ৩৫এ সহ অন্যান্য রেয়াত পাবে। যদি না আদালত বিশেষভাবে আদেশ দেন তাকে আমৃত্যু জেলখানায় থাকতে হবে। আইনজীবী শিশির মনির বলেন, যাবজ্জীবন সাজা হলে দ-িত ব্যক্তিকে ৩০ বছর কারাগারে থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি রেয়াতি সুবিধা পাবেন। আমৃত্যু কারাদ- হলে দ-িত কোনো রেয়াত পাবেন না। যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস বিষয়ে অভিমত দিয়ে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আনা আবেদনের ওপর আজ ১ ডিসেম্বর রায়ের তারিখ ধার্য ছিল। ২৪ নভেম্বর আদালত দিন ধার্যের এ আদেশ দেন আপিল বিভাগ। গত বছরের ১১ এপ্রিল এ মামলায় চারজন এমিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। পরে তারা তাদের মতামত তুলে ধরেন। এমিকাস কিউরিরা ছিলেন- সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, এএফ হাসান আরিফ, আব্দুর রেজাক খান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মারা গেলে এডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন এটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ২০০১ সালে সাভারে জামান নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদ- দিয়ে ২০০৩ সালের ১৫ অক্টোবর রায় দেন বিচারিক আদালত। দুই আসামি হলেন আতাউর মৃধা ও আনোয়ার হোসেন।

বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করেন। অন্যদিকে তাদের মৃত্যুদ- অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে শুনানির জন্য ওঠে। শুনানি শেষে ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট দুই আসামির মৃত্যুদ- বহাল রেখে রায় দেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধ আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল করেন। ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ রায় দেন। রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদ- কমিয়ে যাবজ্জীবন দেয়া হয়। একই সঙ্গে আপিল বিভাগ যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাসসহ ৭ দফা অভিমত দেন। আপিল বিভাগের ওই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আসামি আতাউর মৃধা আবেদন করেন।

গত বছরের ১১ জুলাই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চে শুনানি শেষে বিষয়টি সিএভি রাখেন। তখন রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রয়াত এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আর বর্তমান এটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন এমিকাস কিউরি হিসেবে মত দেন। শুনানিতে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছিলেন, যাবজ্জীবন সাজার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকতে হবে। আমাদের আইনে যাবজ্জীবন কারাদ- হিসেবে ৩০ বছর বলা আছে। যা রেয়াত পাওয়ার পর সাড়ে ২২ বছর হয়। উন্নত বিশ্বেও সাজার মেয়াদ বলে দেয়া হয়। সেখানে প্যারোল ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদ- প্রাপ্তদের দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে সে ব্যবস্থা নেই। তাই যাবজ্জীবন হিসেবে আমৃত্যু কারাদ- দেয়া হলে কারাগারগুলো বৃদ্ধাশ্রম হয়ে যাবে। ঘোষিত রায় অনুযায়ী ‘যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস’ কিনা এ রায় জানা গেল।

Check Also

কুয়েটের ৯ শিক্ষার্থী বহিষ্কার

কুয়েটের ৯ শিক্ষার্থী বহিষ্কার

বিএম রাকিব হাসান, খুলনা ব্যুরোঃ- খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ৯ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *