Sunday , September 27 2020
Breaking News
Home / আরও... / করোনা পরিস্থিতিতে আবেগ নয়, সময়ের দাবি মতে চলুন : ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

করোনা পরিস্থিতিতে আবেগ নয়, সময়ের দাবি মতে চলুন : ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

দ্বীন

– ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

প্রবৃত্তির তাড়না পূরণ নয় আল্লাহ তাঁর রসূলের আনুগত্যের নাম দ্বীন

একবার রসূল সল্লাল্লাহু  আলইহি ওয়াসল্লাম আদেশ দিলেন, যখন বৃষ্টি হয় এবং ময়লা কাঁদা এত বেশি হয় যে, চলতে ফিরতে মানুষের খুব বেশি কষ্ট হয়, পা পিছলে যাওয়া আশষ্কা হয়, ময়লা-কাদায় পোশাক নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়, এমতবস্থায় শরীয়ত অনুমতি দিয়েছে যে, মানুষ মসজিদের স্থলে ঘরে নামায পড়বে।(বুখারী)

হযরহ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমার ঘটনা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা একদিন মসজিদে বসে ছিলেন। ইত্যবসরে আযানের সময় হল। সঙ্গে সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টিও শুরু হল। মুয়াজ্জিন আযান দিলেন। তিনি মুয়াজ্জিনকে বললেন, এ ঘোষণাও করে দাও, ‘সবাই নিজ নিজ ঘরে নামায পড়ুন।’

কিন্তু এই বাক্য অন্যান্যাদের কাছে খুব অপরিচিত মনে হল। কারণ সর্বদা মানুষ দেখে ও শুনে আসছে যে, মসজিদ থেকে এ ঘোষণা হয়, ‘নামাযের জন্য আস, সফলতার জন্য আস।’ কিন্তু আজ বিপরীত ঘোষণা হচ্ছে, যে নিজ নিজ ঘরে নামায পড়ুন। তাই লোকেরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হযরত! এটা আপনি কি করলেন? আপনি মানুষকে মসজিদে আসতে বারণ করছেন? উত্তরে তিনি বলনে, ‘হ্যাঁ! আমি তা এমন ঘোষণা করাবই। কারণ এমন ঘোষণা সেই সত্ত্বা থেকেও দেয়া হয়েছে, যিনি আমার থেকেও উত্তম এবং তোমার থেকেও উত্তম।’(বুখারী)

সায়েখুল ইসলাম আল্লামা মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেন, সময়ের দাবি মতে চলার নাম হল দ্বীন। যে সময় দ্বীনের চাহিদা যা হবে, তাই পালন করতে হবে। সময়ের দাবি যদি হয় মাতা-পিতার খেদমত করা, তাহলে যে সময়ে জিহাদের কোন মূল্য নেই, জামাতে নামায পড়ার কোন অর্থ নেই। এসব ইবাদত যথাস্থানে অত্যন্ত ফযীলাতপূর্ণ। কিন্তু দেখতে হবে, এখন আমাকে সর্বপ্রথম কোন কাজটি করতে হবে।

হিজরত ও জিহাদ আল্লাহ তা’য়ালার কাছে প্রিয়তম দুটি আমাল। কিন্তু যদি কারও মাতা-পিতা অসুস্থ কিংবা বৃদ্ধ হয়ে যায় এবং ঐ সময় তাদের সেবা-শূশ্রূশা করার মত কেউ না থাকে, যখন তাদের জন্য প্রয়োজন খেদমত তবে তাকে এমন গুরুত্বপূর্ণ আমল থেকে পর্যন্ত অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তখন মাতা-পিতার সেবা করাই তার প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় এবং এর ফলে হিজরত ও জিহাদকারীদের সমতুল্য সওয়াব সে প্রাপ্ত হবে।

এক ব্যক্তি রসূলাল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আগমন করল এবং বলল, আমি আপনার কাছে হিজরত ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের বায়আত হতে এসেছি। রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে চাইলেন, তার মাতা-পিতা বেঁচে আছে কিনা? লোকটি উত্তর করল, হ্যাঁ, উভয়েই বেঁচে আছেন। রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তোমার মাতা-পিতার কাছে ফিরে যাও এবং তাদের সেবা কর।(বূখারী, মুসলিম) এই হাদীসের উপর ভিত্তি করে ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, যদি ফরজে আইন না হয় তবে মাতা-পিতার অনুমতি ব্যতিত জিহাদ কিংবা দ্বীন শিক্ষা করার জন্য নিজ শহরের বাইরে যাওয়া যাবে না।

হযরত উয়াইস করনীর রহমাতুল্লাহি আলাইহির ঘটনা ইতিহাসে দীপ্তিময় হয়ে আছে। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একনজর দেখার জন্য যিনি ছিলেন মাতোয়ারা। তিনি রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হুকুমের সামনে নিজের কামনাকে কুরবান করে দিলেন। মায়ের খেদমতের জন্য তিনি সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য ছেড়ে দিলেন। ফলে তিনি সাহাবী উপাধিতে ভূষিত হতে পারলেন না। অথচ একজন সাধারণ সাহাবার মার্যাদাও এতবেশি যে, একজন ওলী যত বড় ওলীই হোন না কেন, তিনি একজন সাধারণ সাহাবার মর্যাদার কাছেও যেতে পারেন না।

ডা.আবদুল হাই রহমাতুল্লাহি আলাইহি একটি কথা বলতেন। হৃদয়পটে যত্ন করে রাখার মত। তিনি বলতেন, ভাই! নিজের কামনা পূর্ণ করার নাম দ্বীন নয়, বরং দ্বীন হল আল্লাহ ও তাঁর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করার নাম। প্রথমে লক্ষ্য রাখবে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী চান? সেটা পূর্ণ করা। এটাই দ্বীন। নিজ আগ্রহ আবেগ, কামনা-বাসনা পূর্ণ করার নাম দ্বীন নয়। যেমন কারো আগ্রহ সৃষ্টি হল প্রথম কাতারে নামায পড়ার প্রতি। কারো মনে জাগল, জিহাদ করবে। কারো মনে চাইল দাওয়াত-তাবলীগে সময় দেবে। এসব তো অবশ্যই সওয়াবের কাজ। নিঃসন্দেহে এগুলো দ্বীনের কাজ। তবে তোমাকে দেখতে হবে, এ মূহুর্তে দ্বীনের চাহিদা কী? যেমন তোমার মনে চাইল, জামাতের প্রথম কাতারে শরীক হওয়ার। অথচ ঘরে তোমার মাতা-পিতা খুবই অসুস্থ। নড়াচড়া করতে পর্যন্ত পারছেন না। তাহলে এ মুহূর্তে জামাতে শরীক হওয়ার চেয়েও মাতা-পিতার খেদমত করার গুরুত্ব অধিক। এ মুহূর্তে আল্লাহ তোমার কাছ থেকে এটাই চান। তাই এ মুহূর্তে তোমার কর্তব্য হবে ঘরে একাকী নামায সেরে নেয়া এবং মাতা-পিতার খেদমতে পরিরপূর্ণভাবে আত্ননিয়োগ করা। এ মুহূর্তে যদি মাতা-পিতার খেদমত না করে তুমি চলে যাও মসজিদে জামাতে শরীক হতে, তাহলে এটার নাম দ্বীন নয় বরং এটা হবে নিজের কামনাকে অগ্রাধিকার দেয়া।

অবশ্য শরীয়তের এ বিধান তখন প্রযোজ্য হবে, যখন মসজিদ হবে দূরবর্তী অবস্থানে। যদি মসজিদ নিকটেই হয়, সেখানে গেলে মা-বাবার খেদমতে অসুবিধা হবে না, তখন মসজিদে যাওয়াই শ্রেয়।

সায়েখুল ইসলাম আরো বলেন, আপনি মনোযোগ সহকারে বসে আল্লাহর যিকির করছেন। এমন সময় আযানের শব্দ কানে ঢুকল। আপনার প্রতি আদেশ এসে পড়ল, যিকির বাদ দাও এবং চুপচাপ আযান শোন এবং তার উত্তর দাও। যদিও তাতে সময় ব্যয় হবে। আযানের সময়টিতে যিকির অব্যাহত রাখলে আরও কয়েকবার আল্লাহু নাম উচ্চারিত হত। কিন্তু আপনি থেমে গেলেন। যখন থামিয়ে দেয়া হল, তখন থেমে যান। এখন যিকিরে কোন সওয়াব নেই। এখন সওয়াব আযান শ্রবণ ও তার উত্তর দেয়ার মধ্যে।

ইফতারে দ্রুততা করার আদেশ করা হয়েছে। এই মুহূর্ত পর্যন্ত অনাহার থাকা এবং কিছু না খাওয়া সওয়াবের কারণ ছিল। এই মুহূর্ত পর্যন্ত পিপাসার্ত থাকা সওয়াবের কারণ ছিল। এর অনেক ফযীলাত ও বিপুল সওয়াবের কারণ ছিল। কিন্তু যখন আমি বললাম, খাও, এবার খাওয়ায় বিলম্ব করা গোনাহ। কারণ এখন খেতে বিলম্ব করা অর্থ হল, রোযার মধ্যে তুমি নিজের থেকে যোগ করে নিয়েছ।

সাহরীতে বিলম্ব করা উত্তম। কেউ যদি আগে ভাগেই সাহরী খেয়ে শুয়ে পড়ে, তাহলে এটা সুন্নাতের খেলাফ। বরং সাহরী শেষ মুহূর্তে খাওয়া উত্তম। কেননা আগে ভাগে খেয়ে শুয়ে পড়া মানে রোযার মেয়াদে নিজের থেকে যোগ করা। এটা আনুগত্য নয়- এটা নিজের থেকে কিছু করা।

এজন্য খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে, নিজের চাহিদা ও নিজের প্রবৃত্তির তাড়না পূরণের নাম দ্বীন নয়। দ্বীন হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্যের নাম। তা আমার বুঝে আসুক বা না আসুক।(ইসলাম আওর হামারী যিন্দেগী)

এখন মনে করুন আমি করোনা ভাইরাস বহন করছি এমতাবস্থায় আমি সমাবেশে যোগ দিলাম, আমার পাশে যে ভাইটি ছিল সে আমার নিকট হতে বহন করে তার বাড়িতে নিয়ে গেলো, তার কাছ থেকে তার পরিবারের লোকজন গ্রহন করল। আবার উল্টাটাও হতে পারে, যেমন আমি কোন সমাবেশে গেলাম সেখানে আমার কোন ভাই এই ভাইরাসটি বহন করছিল, তার কাছ থেকে আমি পেয়ে গেলাম, এবার আমি বাসায় আসলাম এবং আমার নিকট হতে আমার বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তান-স্ত্রী সহ সকলকে দিয়ে দিলাম। এখন সকলের অসুস্থ হওয়া শুরু হল এবং কষ্টের মধ্যে পড়ে গেল তাহলে এটা কি হঠকারিতা নয়। লক্ষ করুন, আমার মনের চাহিদা ও প্রবৃত্তির তাড়না পূরণ করতে গিয়ে কতগুলো মানুষকে ক্ষতির সম্মুখীন করলাম। মনে রাখবেন ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা যেখানে গোড়ামীর কোন স্থান নেই। মহান আল্লাহ তা’য়ালা কোন ব্যক্তির উপর এমন কোন কাজের বোঝা চাপিয়ে দেন না যা তার সাধ্যের বাইরে।(সূরা বাকারা;২৮৬)

প্রিয়নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, অসুস্থ অবস্থায় যদি আমল ছুটে যায়, তাহলে সুস্থ অবস্থায় যে আমলগুলো করা হত, এই অবস্থায়ও সেগুলোর সওয়াব লেখা হয়।(ইসলাম আওর হামারী যিন্দেগী)

পূর্বে আমরা যে সমস্ত দ্বীনী কাজে আনজাম দিতাম যদি বর্তমান পরিস্থিতিতে সে সমস্ত দ্বীনী কাজে হাজির হতে না পারি, হাজির হলে যে ফায়েদা পাওয়া যেত ঐ ফায়েদাই আল্লাহ আমাদের দিয়ে দেবেন ইনশা’আল্লাহ। ঐ সমস্ত দ্বীনী কাজে হাজির হলে যে নূর ও বরকত অর্জিত হত হাজির হতে না পারলেও সেই নূর ও বরকত অর্জিত হবে ইনশা’আল্লাহ।

‘হাক্কু’ হল সম্পূর্ন শরীয়ত। এতে আল্লাহর হক এবং বান্দার হক উভয়ই শামিল। আর ‘হুদুদ’ হল সব সুন্নাত। তথা সুন্নাতের মাধ্যমে জানা যায় কোন হকের পরিসীমা কতটুকু। আল্লাহর হক কতটুকু এবং বান্দার হক কতটুকু। রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের মাপকাঠিতে নির্ণয় করতে হবে কোন বিষয়ের উপর কী পরিমান আমল করতে হবে। অতএব আল্লাহ এবং তাঁর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশের প্রতি লক্ষ্য রেখে চলা। আবেগের উপর নির্ভর না করা। সীমানা রক্ষা করে চলা। সময়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে, সময়ের দাবি মতে, যে সময়ে দ্বীনের চাহিদা যা হবে এবং এর জন্য যে ধরণের প্রস্তুতি এবং উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার প্রয়োজন তাই করা।

তবে মনে রাখতে হবে, সময়ের দাবি মতে চলা এই কথাটি খুব নাজুক। যে কোন বিষয়কে সামনে রেখে দ্বীলের খায়েশাত অনুযায়ী চলার নাম সময়ের দাবি মতে চলা নয়। এখানে আল্লাহর হুকুম ও রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতকে সামনে রাখা। আর এজন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞ, দক্ষ, প্রজ্ঞাবান ও দুনিয়াত্যগী ওলামায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করা এবং তাদের সিদ্ধান্তের উপর আমাল করা।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।  মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিকটা বুঝার তৌফিক দান করুন।আমিন।

লেখক: – ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা

 

Check Also

বন্যা

ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে বন্যা হলে তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে

স্টাফরিপোটার   : ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে বন্যা হলে তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে জানিয়ে এ বিষয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *