Saturday , October 24 2020
Breaking News
Home / খবর / ড. নাজমুল হাসান’ আচরণের সৌন্দর্য্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

ড. নাজমুল হাসান’ আচরণের সৌন্দর্য্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

ড. নাজমুল হাসান’

-ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন :   মানুষ সৌন্দর্য্যকে ভালবাসে আর সৌন্দর্য্য দ্বারা আকৃষ্ট হয়। যেখানে সে সৌন্দর্য্য দেখবে সে ঐদিকেই যেতে চায়। তা মানুষের চেহারার সৌন্দর্য্য হোক, প্রকৃতির সৌন্দর্য্য হোক, আর জোৎনা রাতের আকাশের সৌন্দর্য্য হোক, আর মানুষের দ্বীলের সৌন্দর্য্য হোক। মানুষের চেহারার সৌন্দর্য্য এক নযর দেখল, তাঁরপর মুগ্ধ হল, ভাল লাগল তাঁরপর চলে গেল। প্রকৃতির সৌন্দর্য্য দেখবে তাকিয়ে থাকবে, তাঁরপর চলে আসবে। জোৎনা রাতের আকাশের সৌন্দর্য্য দেখবে উপভোগ করবে এক সময় তা ফুরিয়ে যাবে। মানুষের সুন্দর দ্বীল দেখবে তো আকৃষ্ট হবে। মানুষের দ্বীলের সৌন্দর্য্য অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বেশি প্রবল। মানুষের আচারণের সৌন্দর্য্য দূরকে টেনে নিয়ে আসে কাছে আর কাছের মানুষ গুলোকে করে তোলে আরো ঘনিষ্ঠ। হৃদয়ের বন্ধনে ছড়িয়ে পড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস। মানুষ তাঁর উত্তম আচরণ ও আচরণের সৌন্দর্য্য দ্বারা পরিবার, সমাজ সহ অলোকিত করে থাকে বহুদুর যত দুর তাঁর দৃষ্টি পৌঁছায়।

আমরা আজ এমনই একজন সুন্দর দ্বীলের মানুষের কথা আলোচনা করব। যার নাম ড. মোঃ নাজমুল হাসান। জন্ম ১৯৬৬ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার দৌলতগঞ্জ গ্রামে। যিনি মৎস্য অধিদপ্তরের অধীন খুলনা কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাবে কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ১৬ আগষ্ট, ২০২০ অনুমানিক রাত ১০.০০ টায় কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) ঢাকাতে চিকিৎসাধীন অবস্থাতায় আমাদের সকলকে দু:খের সাগরে ভাসিয়ে ইহলোক ত্যাগ করে মহান আল্লাহর তা’য়ালার সান্নিধ্য লাভে পরপাড়ে পাড়ি জ

ড. নাজমুল হাসান’

মিয়েছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।

যখন শুনলাম স্যার আর নেই। সংবাদটি বিশ্বাস হচ্ছিল না, আসলেই বিশ্বাস করা অনেক কঠিন ছিল। থ হয়ে গেলাম। বাক রুদ্ধ হয়ে গেল। একাকি বসে থাকলাম অনেকক্ষণ। তারঁ কথা গুলো যেন আমার কানে হাতুড়ির মত আঘাত হানছিল। মাস খানিক আগের কথা হবে হয়ত। তিনি আমাকে বললেন, ‘ওস্তাদ করোনাতে যে ভাবে সব পরিচিত মানুষ জন মারা যাচ্ছে তাতে আমার যেন ঠিক ভাল ঠেকছে না’। আর আমি তাঁর সাথে অনেকটা রসিকতায় করছিলাম, ‘স্যার অনর্থক আপনি চিন্তা করছেন’।

খুব কাছের এজন মানুষ হঠাৎ এভাবে বিদায় নিলে তা যে কতটা কষ্টকর তা বোঝানো অনেক কঠিন। কিন্তু কিছুই করার নেই। এটিই মহান আল্লাহ তা’য়ালার ফায়ছালা। এর উপরেই আমাদের রাজি থাকতে হবে। আর স্মরণ করতে হবে আমাদের নিজেদের কথা, প্রতিটি ক্ষণ আমাদের জীবনের মোট সময় হতে প্রতিনিয়ত বিয়োগ হয়ে যাচ্ছে।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখার মত একজন মানুষ। যিনি ছিলেন মিষ্টভাষী ও অত্যন্ত বিনয়ী। তাঁর সমস্ত ফটোগ্রাফ গুলোর দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায় তিনি কতটা বিনয়ী ছিলেন। হাত দুটি সামনে দিয়ে জড়সড় হয়ে বোকা শোকা মানুষের মত দাড়িয়ে রয়েছেন। এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারির কথা, আমারা অফিসিয়াল পিকনিকে গিয়েছিলাম বটিয়াঘাটার ওয়াই.সি রিসোর্টে। ভাবী আর স্যার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আর ছবি উঠাচ্ছিলেন আমাদের টেকনিক্যল এসিস্ট্যান্ট রাশেদ সাহেব, ওখানেও স্যারের সেই একই ভঙ্গি। ভাবীর পাশে দাঁড়িয়ে সামনে হাত দুটি দিয়ে জড়সড়ো হয়ে দাড়িয়ে রয়েছেন। আমি তৎক্ষণাৎ জোর আপত্তি উঠালাম যে, না স্যার ভাবীর পাশে এরকম জড় সড় হয়ে ছবি উঠানো যাবে না। স্যার একটা মুচকি হাসি দিলেন এরপর আমাকে চুপি চুপি পাশে ডাকলেন আর মোবাইলের ভিতর হতে একটি ছবি দেখালেন, যে ছবিটিতে স্যারের হাত ভাবী কাধের উপরে ছিল। আমি হাসলাম আর বললাম, হ্যাঁ এইটা ঠিক আছে।

তিনি নারী সহকর্মীদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সুহৃদয়। পিতা যেমন তাঁর কন্যাদেরকে সর্বক্ষণ আগলে রাখেন তিনিও তেমনি আগলে রাখতেন তাদের। যখনি যে কোন সমস্যা নিয়ে তারা স্যারের সামনে যেতেন তখনি তিনি আন্তরিকতাঁর সাথে তাঁর সমাধান করে দিতেন।  তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যাগুলোও তিনি আন্তরিকতাঁর সাথে দেখভাল করতেন। আমার নারী সহকর্মীরা কোন সমস্যার কথা আমার নিকটে বললে আমি তাদেরকে বলতাম সোজা স্যারের কাছে চলে যান পানির মত সমাধান হয়ে যাবে। তারা স্যারের কাছ হতে ফিরে এসে বলত জি ভাই আপনি সত্য বলেছেন একদম পানির মত সমাধান হয়ে গেছে।

ড. নাজমুল হাসান’

একদিনের ঘটনা! বিদ্যুৎ ছিলনা কোন কারণে জেনারেটর সার্পোটও ছিলনা সাথে সাথে । খুব গরম পড়ছিল। আমি কোনকাজে অফিসে স্যারের রুমে গেলাম। চেয়ারে বসতেই বলে ফেললাম খুব গরম তো। তৎক্ষণাৎ স্যার চেয়ার হতে উঠে তাঁর রুমের বন্ধ জানালা গুলো খুলতে আরম্ভ করলেন। আমিতো হতভম্ব হয়ে গেলাম। লক্ষ্য করুন, যেহেতু আমি তাঁর অনেক জুনিয়র সেহেতু তিনি আমাকে জানালাগুলো খুলে দিতে বলতে পারতেন বা কোন পিওনকে ডেকে তা খুলিয়ে নিতে বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না, নিজ হাতেই খুললেন। আমার অনেক ব্যক্তিগত কাজও তিনি নিজ হাতে করে দিতেন যে পরিস্থিতিগুলো আমার জন্য হয়ে উঠত অত্যন্ত লজ্জার। যে কারণে আমি হঠাৎ হঠাৎ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যেতাম। এ ঘটনাগুলো হতেই আমি বুঝেছিলাম তিনি নিশ্চয় কোন বংশীয় ঘরের সন্তান হবেন।

আমার চরিত্রের মধ্যে একটি সমস্যা রয়েছে। সেটি হচ্ছে, ‘ডোন্ট কেয়ার এটিচুড’। যার কারণে আমি বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন দপ্তর প্রধানদের রোষানলেও পড়েছি। যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে আমার এসিআরের উপর পর্যন্তও। আর এর ধারাবাহিকতায় আমি স্যারের সামনেও অনেক সময় স্টেট ফর ওয়ার্ড অর্থাৎ সোজা সাপটা কথা বলে ফেলতাম, কিন্তু স্যার কখনো কোন প্রতি উত্তর করতেন না, একটি হাসি দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতেন। তিনি কখনো সরাসরি কোন আদেশ করতেন না। তাঁর আদেশের ভাষাগুলো ছিল এরকম, দেখনতো ওস্তাদ এটা কীভাবে করা যায়? বা, ওস্তাদ কী করা যায় বলেন তো? বা, ওস্তাদ এই কাজ টা কে করতে পারে দেখেন তো? হ্যাঁ তিনি আমাকে ওস্তাদ বলেই সম্বোধন করতেন। আর তাঁর দেখা দেখি ল্যাবের জুনিয়র সিনিয়র সকলেই আমাকে ওস্তাদ বলেই সম্বোধন করেন। এছাড়াও তাঁর উত্তম গুনাবলীর মধ্য অন্যতম ছিল তিনি ছোট বড় সকলকেই আপনি বলে সম্বোধন করতেন।

ড. নাজমুল হাসান’

কর্মচারীদের প্রতিও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সদয়। তাদের যে কোন সুবিধা অসুবিধায় তিনি এগিয়ে আসতেন পরামর্শ ও অর্থ সাহায্যের মাধ্যমে। স্যারের মৃত্যু সংবাদ তাদের নিকটে পৌঁছার পর তাদের কান্নার দৃশ্য দেখেই বোঝা যায় তারা স্যারকে কতটা ভালবাসতেন। কারো পিতা-মাতাঁর মৃত্যুতেও আমি এমন কাঁদতে দেখিনি কাউকে। আমার জানা আছে তিনি তাঁর বাসার গৃহপরিচারিকার বিয়ে দেন অতি ধুমধামে লক্ষাধিক টাকা খরচের মাধ্যমে। যেখানে তাঁর উদার মানসিকতাঁর পরিচয় পাওয়া যায়। ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেওয়ার সময় বড় নোটটিই পকেট হতে বের করে দিতেন তিনি। মসজিদ ও মাদ্রাসায় দানের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন উদারহস্ত।

আমার এই চাকুরী জীবনে অনেক দফতর প্রধানকেই দেখেছি যারা কাজকে কঠিন করতে পছন্দ করতেন। যেমন, কারো উপর অনর্থক কিছু কাজ চাপিয়ে দেওয়া। ছুটির দিনে অনর্থ কিছু কাজ সৃষ্টি করে অফিসে আসতে বলা। কাউকে শায়েস্থা করবার জন্য তাঁর নামে অপবাদ রটিয়ে দেওয়া। উৎকোচ গ্রহনের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ধমকি ধামকি দেওয়া, কর্ম বিহীন করে রাখা, বিভিন্ন রকম প্রেসারে রাখা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু স্যার এই সমস্ত বদগুন হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন।

একে অপরের প্রতি কোন অভিযোগ থাকলে তা তিনি ঠান্ডা মাথায় শুনতেন এরপর নিজ বিচার বিশ্লেষণ মত বুদ্ধিমত্তার সাথে সিদ্ধান্ত নিতেন। কখনো হঠকারীতা করতেন না। তাঁর ভিতরে প্রতিশোধ নেওয়ার কোন মানসিকতা কখনোও লক্ষ্য করিনি। ব্যক্তিগত চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট চাহীদাকেই প্রাধান্য দিতেন সবসময়।

ড. নাজমুল হাসান’

এছাড়াও তিনি ছিলেন, ধৈর্য, মনোবল, দৃঢ়তা ও অটুট সংকল্পের অধিকারী একজন মানুষ। আল্লাহপ্রীতি, একনিষ্ঠতা, জ্ঞান, ধর্মীয় বোধশক্তি ও দীনের খিদমত ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যিনি আতিথেয়তা, সামাজিকতা, পরোপকারিতা, দানশীলতা ও উদারতাঁর দ্বারা নিজের চারিত্রিক মহত্ত্বের ছবি সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

মানুষ তাঁর কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকে। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর সকল গোনাহ মাফ করে দিয়ে তাঁকে সর্বৎকৃষ্ট জান্নাত দান করুন। তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদেরকে সবর করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক:   -ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা

ড. নাজমুল হাসান’

 

Check Also

মেহেরপুরের ৫ রোভারের

মেহেরপুরের ৫ রোভারের ২৩ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া মহাফিল অনুষ্ঠান

মেহেরপুর প্রতিনিধিঃ মেহেরপুরের ৫ রোভারের ২৩ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া মহাফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেহেরপুরের কৃতি ৫ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *