Saturday , November 28 2020
Breaking News
Home / খবর / দেশের ২১ জেলায় বন্যায় ১১১ জনের মৃত্যু ও ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ লাখ মানুষ

দেশের ২১ জেলায় বন্যায় ১১১ জনের মৃত্যু ও ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ লাখ মানুষ

bona

স্টাফ রিপোর্টার :   দেশে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি ঘটছে। উত্তরাঞ্চল, উত্তর পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল মিলিয়ে অন্তত ২১ জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল টানা তিন সপ্তাহ ধরে বানের জলে ভাসছে। তবে উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। এসব এলাকায় তিন দফায় বন্যায় ১১১ জনের মৃত্যুসহ ৪০ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদ-নদীর ব্যাপক ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ।
জানা গেছে, যেসব এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে, সেইসব এলাকার নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি ও আবাদি ফসল। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, চলমান বন্যায় দেশের অন্তত ৩১ শতাংশ নিম্নাঞ্চল ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। আগামী কয়েক দিনে প্লাবিত এলাকা আরো বাড়বে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, এক মাসের মধ্যে তিন দফায় দেশের ৩১টি জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের ২১ জেলা বন্যায় আক্রান্ত। জেলাগুলো হলো- লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, রংপুর, সুনামগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুর, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, নেত্রকোনা, নওগাঁ, ফেনী, ঢাকা, শরীয়তপুর ও মুন্সিগঞ্জ। এসব জেলার ১৬৮টি উপজেলার মধ্যে ৭৮টি দুর্গত উপজেলা রয়েছে। এসব জেলা-উপজেলার এক হাজার ৫৩৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪০১টি ইউনিয়ন আক্রান্ত। এ সকল এলাকায় মোট আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৪৩টি। বন্যায় হাজার হাজার মানুুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। ডায়রিয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা (আরটিআই), চর্মরোগ, চোখের প্রদাহ ও অন্যান্য আঘাতজনিত কারণসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বর্তমানে এসব এলাকায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য এক হাজার ৭৬৬টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, গত ৩০ জুন থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত সময়ে বন্যায় দেশের ২১ জেলায় ১১১ জনের মৃত্যু হয়। মোট মৃতের সর্বোচ্চ সংখ্যক ৮৯ জনের মৃত্যু হয় পানিতে ডুবে। এছাড়া ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একজন, সাপের কামড়ে ১২ জন, বজ্রপাতে আটজন এবং অন্যান্য কারণে একজনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় পানিতে ডুবে আটজন এবং সাপের কামড়ে তিনজনসহ মোট ১১ জনের মৃত্যু হয়। এ পর্যন্ত লালমনিরহাটে ১০ জন, কুড়িগ্রামে ২০ জন, গাইবান্ধায় ১০ জন, নীলফামারীতে দুইজন, রংপুরে তিনজন, সুনামগঞ্জে ১০ জন, বগুড়ায় ২৭ জন, টাঙ্গাইলে ১৩ জন, মানিকগঞ্জে আটজন, নেত্রকোনায় পাঁচজন এবং শরীয়তপুরে একজনের মৃত্যু হয়।

বন্যা আক্রান্ত ২১ জেলায় গত ৩০ জুন থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত সময়ে ডায়রিয়া চার হাজার ২০৯ জন, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যায় এক হাজার ১১১ জন, বজ্রপাতে ৩৮ জন, সাপের কামড়ে ২৬ জন, পানিতে ডুবে ৯২ জন, চর্মরোগে এক হাজার ৪৫৬ জন, চোখের প্রদাহে ২৪৪ জন, আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ২৭২ জন এবং অন্যান্য রোগে দুই হাজার ১৮ জনসহ মোট ৯ হাজার ৪৬৬ জন আক্রান্ত হন। প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ নিম্নে তুলে ধরা হলো।

নওগাঁ প্রতিনিধি জানায়, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নওগাঁয় বন্যা পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়েছে। আত্রাই নদীর পানি গতকাল দুপুরে জোতবাজার পয়েন্টে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে আগেই ভেঙে যাওয়া বাঁধ দিয়ে আবার প্লাবিত হয়েছে রাস্তাঘাট, ফসলের মাঠ ও ঘরবাড়ি।

মির্জাপুর প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। মির্জাপুর পৌরসভা ও উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে চার শতাধিক বাড়িতে পানি ঢুকেছে। প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলার ৫৪টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ২২টি ক্লিনিক, দুটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও পাঁচটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সিলেট প্রতিনিধি জানান, সিলেটের কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি ১৫ দিন পর গতকাল সকাল ৬টায় বিপদসীমার নিচে নেমেছে। সুরমা নদী সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা দিয়ে প্রবাহিত দীর্ঘতম নদী। এ নদীর পানির প্রবাহ পরিমাপ করা হয় সিলেটের কানাইঘাট উপজেলা ও সিলেট শহর পয়েন্টে। কানাইঘাটের লোভাছড়ার কাছে লোভা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে সুরমা। উজানে ভারী বৃষ্টি হলে লোভা থেকে সুরমায় পানির প্রবাহ বাড়ে।

নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, নীলফামারী জেলায় তিস্তা নদীর পানি কমছে। গতকাল বিকেলে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে এই নদীর পানি বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরে যমুনা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি স্থিতিশীল থাকায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল সকাল ৬টায় বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ১১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পানি জামালপুরের পয়েন্টে বিপদসীমার দুই সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় চলছে ত্রাণের জন্য হাহাকার। যেকোনো নৌকা দেখলেই বন্যার্ত মানুষ মনে করছে ত্রাণের নৌকা।

দেওয়ানগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে নদ-নদীতে বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। হাজার হাজার একর জমির ফসল, বাড়িঘর, পথঘাট, জনপদ সব পানিতে তলিয়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার তিন শতাধিক মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠে এবার ঈদুল আযহার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে না। বন্যার কারণে এখনো এসব মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠ পানিতে তলিয়ে রয়েছে। গতকাল বন্যাকবলিত নাটুয়ারপাড়া, খাসরাজবাড়ী, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর, চরগিরিশ, মনসুরনগর, মাইজবাড়ী ও শুভগাছা ইউনিয়ন পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণকালে ইউএনও জাহিদ হাসান সিদ্দিকী, উপজেলা চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান সিরাজী ও পিআইও এ কে এম শাহ আলম মোল্লা এ তথ্য জানান।

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, রৌমারীতে বন্যা এবার ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বানের পানির প্রচ- চাপে রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার শতভাগ মানুষের বাড়িঘরে পানি উঠেছে। এসব মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু সড়কসহ নানা উপায়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

শেরপুর প্রতিনিধি জানান, অতিবর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের পানি আবার সামান্য বেড়েছে। শেরপুর-জামালপুর সড়কের ব্রহ্মপুত্র বীজ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার দশমিক ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে শেরপুর জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে পানিবন্দি মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ বেড়েছে।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় বন্যার পানিতে পড়ে ৪ বছরের একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশুটির নাম হুসাইন আহমদ। সে উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের সিচনী গ্রামের মো. রজব আলীর ছেলে।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, যমুনার পানি আরিচা পয়েন্টে আবার ১৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বিপদসীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে অর্থাৎ ১০ দশমিক ৮ স্তরে প্রবাহিত হয়। ফলে পদ্মা-যমুনার শাখা নদী ইছামতি, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী নদীবাহিত পানিতে শিবালয় উপজেলার সর্বত্র ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ যেন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেকই পেটের পীড়ায় ভুগছে। নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘর পানিমগ্ন হওয়ায় গবাদিপশু-পাখি নিয়ে লোকজন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে। চরাঞ্চল আলোকদিয়ায় ত্রাণ ও গোখাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে প্রবল স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে ফেরি-লঞ্চ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ীতে ফের বাড়ছে পদ্মার পানি। আর এতে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। গতকাল রাজবাড়ীতে আবার পদ্মার পানি বাড়তে শুরু করেছে।

গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ওপার থেকে নেমে আসা পানি ও ভারী বর্ষণের কারণে করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। করতোয়া নদীর পানি কাটাখালী পয়েন্টে ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করতোয়া নদীর পানি উপচে নদী তীরবর্তী ৭টি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বগুড়ার সোনাতলায় যমুনা নদী বিপদসীমার ১১০ সেন্টিমিটার ও বাঙ্গালী নদী ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ওই উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ৩২ গ্রামের পাঁচ হাজার ৬৩৮ পরিবারের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সেই সাথে বর্তমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ও বন্যার কারণে আরো লক্ষাধিক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে।

বন্যায়

Check Also

ফেরা-মাদকাসক্তি পূনর্বাসন কেন্দ্র

ডাঃ আব্দুল্লাহ’স চেম্বারের সৌজন্যে ফেরা-মাদকাসক্তি পূনর্বাসন কেন্দ্র ও ধুমকেতু আইডিয়াল স্কুলের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প

ছবি: শরিফ মাহমুদ কুষ্টিয়া থেকে শরিফ মাহমুদ :  ফেরা-মাদকাসক্তি পূনর্বাসন কেন্দ্র ও ধুমকেতু আইডিয়াল স্কুলের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *