Friday , August 14 2020
Breaking News
Home / আরও... / করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ৮) – ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ৮) – ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

 

ছোট বেলায় কোন একটি বই-এ যেন পড়েছিলাম, একটি ছোট্ট গ্রাম, আর এই গ্রামের ভিতরে রয়েছে একটি পাঠশালা। পাঠশালার মেধাবী ছাত্র আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহ পাঁচ ক্লাশে জলপানি পেয়ে পাশ করেছে। এরপর উচ্চক্লাশে লেখাপড়ার ব্যবস্থা আর গ্রামে নেই তাই এখন তাকে লেখাপড়ার জন্য যেতে হবে শহরে। মাথায় বিছানা আর কাপড়ের গাট্টি, হাতে খাবারের একটি ছোট্ট পুটুলি। যাত্রার শুরুতেই আব্দুল্লাহ দোয়া নেওয়ার জন্য গেল ওস্তাদজীর বাড়ীতে। মাথার গাট্টি আর হাতের পুটুলি মাটিতে নামিয়ে আব্দুল্লাহ বিনয়ের সাথে ওস্তাদজীর সামনে মাথা হেঁট করে দাড়াঁল। কাঁন্নাবিজড়িত কাঁপাকাঁপা কন্ঠের উচ্চারন, ‘ওস্তাদজী শহরে পড়’তে যাইতেআছি আমারে দোওয়া কইরেন’। ওস্তাদজী আদরের সাথে আব্দুল্লাহকে কাছে ডাকলেন, স্নেহভরা হাতটি রাখলেন তার মাথার উপর, বললেন, ‘লেখাপড়া শিখে তুমি অনেক বড় হবে এ দোওয়া আমি করি না, আমি এ দোওয়াই করি লেখাপড়া শিখে যেন তুমি মানুষ হও’।

মানুষ আবার মানুষ হবে কিভাবে?

কেউ যদি বলে যে, ওকে মানুষ বানাও। স্বাভাবিক ভাবে বলবে যে, কি বানাতে হবে আমি বুঝতে পাচ্ছি না। একেক ধরণের মানুষ ‘মানুষের’ একেক ধরণের অর্থ বা সংজ্ঞা দিয়েছে। মনেকরুন একজনের পাঁচ ছেলে। চার ছেলে লেখাপড়া করেছে, বড় ডিগ্রীধারী হয়েছে। আরেক ছেলে হয়েছে বখাটে। অনেক সময় লোকে বলে যে, ওনার পাঁচ ছেলে; চারজন মানুষ হয়েছে, একজনকে মানুষ বানাতে পারে নি। তো ও কি হয়েছে? মুরগী হয়েছে না হাঁস? বোঝা যায় মোটামুটি যে সে কি বলতে চায়। কিন্তু যদি বিশ্লেষণ করতে চায় তো খুব সহজ নয়।

ড.মুশফিক আহমদ রহমাতুল্লাহি আলাইহির ভাষায় বলছি, একজন বড় বৈজ্ঞানিক বা বড় দার্শনিক; তার বুদ্ধির কোন সীমা নেই, কিন্তু বউ ওকে ছেড়ে চলে গেছে।

– কেন?

-বলে যে ওর কোন Feeling-ই নেই।

সে (স্ত্রী) একটা মানুষ চায়।

ছেলে তার বাপকে পাত্তাই দেয় না।

-এত বড় বৈজ্ঞানিক; পাত্তা দাও না কেন?

– ধেত! মানুষই নয়।

-কি মানুষ নয়?

স্ত্রীর ভাষা হয়তো অনেক উগ্র হবে। ছেলের ভাষা, যদি আদব জানে হয়তো অত উগ্র হবে না। যদি দৃষ্টান্ত চায়, তুমি যে এভাবে বলছ?

-তোমার বাপের ব্যাপারে তোমার অভিযোগটা কি? তোমাকে মারে, গালি দেয়, না কি করে?

-সে বলে যে, না কিচ্ছু না।

-তাহলে কি?

-বলে যে, আমার এক্সিডেন্ট হয়েছিল, মুমূর্ষু অবস্থা। আব্বাকে খবর দেওয়া হল। আব্বা তার থিওরি, তার বিজ্ঞানের অংক করছিল। ওখান থেকে উঠলও না, খবরও নিল না। পরে আবার তাকে বলা হল, তোমার ছেলে যে হাসপাতালে? উনি বললেন, ‘ও হ্যাঁ। তাইতো তাইতো।’ আবার অংক করতে লেগে গেল। ওতো একটা অংক, ওতো বাপ নয়। আমি একটা বাপ চাই।

আর স্ত্রী হলে বলবে,

-আমি একজন স্বামী চাই। একটা স্বামী, একজন মানুষ। ও মানুষ নয়।

-ও কি খারাপ?

-না, তা নয়।

-ও কি ভালো?

-না, তাও নয়।

খারাপ, ভালো এই শব্দগুলো মানুষের জন্য প্রযোজ্য। মানুষই যদি না হয়, তাহলে খারাপই বা কি আর ভালোই বা কি?

প্রধানত তিনটা মাত্রা নিয়ে একজন মানুষ। এক, তার দেহ। হাত-পা কাজকর্ম করে, চোখ দিয়ে দেখে, কান দিয়ে শোনে, পা দিয়ে চলে, হাত দিয়ে ধরে ইত্যাদি। দুই, তার মস্তিষ্ক; যেটা দিয়ে সে চিন্তা করে। আর তিন, তার ক্বলব; যেটা দিয়ে অনুভব করে।

তার দেহের মাত্রায় মানুষ বড় দূর্বল। মানুষকে আল্লাহ তা’য়ালা দূর্বল করে সৃষ্টি করেছেন।

মানুষের নাকের শক্তি পিঁপড়ার ধারে কাছেও নেই। বাটিতে একটাতে চিনি আরেকটাতে লবণ এনে দিয়ে যদি বলে – গন্ধ নিয়ে বল কোনটিতে চিনি আর কোনটিতে লবণ? বলবে- লবণ, চিনি কোনটারই গন্ধ নেই, বুঝব কেমন করে? বুঝার কোন উপায় নেই। বুঝতেই পারবে না। অথচ মাত্র একদানা চিনি পড়েছে আর পিঁপড়া, আল্লাহই জানেন তার বাড়ি কোথায়; সে ওখান থেকে খবর পেয়ে সেই একদানা চিনি এসে নিয়ে যাবে। শকুন কত দূর থেকে দেখে। গরু শুয়ে আছে; জীবিত না মৃত, সে ওখান থেকে দেখে বুঝতে পারে। মানুষ কাছে থেকে দেখেও অনেক সময় বুঝেনা। এরকম দৃষ্টান্তের কোন অভাব নেই। তো দৈহিক শক্তির ব্যাপারে মানুষ দূর্বল।

বাকি হল চিন্তা। নিঃসন্দেহে গরু, ভেড়া, ছাগলের চেয়ে মানুষ বেশি চিন্তা করতে পারে। কিন্তু এটাও মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য নয়। আজকাল নানান ধরণের কম্পিউটার খেলা আছে। তার মধ্যে দাবা খেলাও আছে। আর ওগুলোর বিভিন্ন লেভেল আছে। উপরের লেভেলে যদি কেউ খেলতে চায়, তো বড় বড় দাবারুরাও পারবে না। আর দাবা খেলা মানেই হচ্ছে – তাকে ভাবতে হয়, চিন্তা করতে হয়। এই জাতীয় যদি চাল হয়, তাহলে পরবর্তীটা কোনটা হবে? সেই হিসেবে চিন্তা ফিকির করে তাকে একটা চাল দিতে হয়। প্রথমত সে হয়তো ১ ঘন্টা চিন্তা-টিন্তা করে তারপর একটা চাল দিল। আর কম্পিউটার তার উত্তরে সেকেন্ডের মধ্যে চাল দিয়ে দিবে। আর ও কম্পিউটারের সাথে পারেও না। আর এই চাল দেওয়ার আগে কম্পিউটার বিভিন্ন সম্ভাবনা ভেবেছে। দাবা খেলার মধ্যে অনেক alternatives অর্থাৎ বিকল্প; এটা হলে কি হবে, ওটা হলে কি হবে, বিভিন্ন পর্যায় চিন্তা করতে হয়। মানুষ এগুলো চিন্তা করতে করতে প্রায় ঘণ্টা খানেক লেগে যায়। এক ঘণ্টা সে চিন্তা করল যে এই চাল দিলে কি হতে পারে, এটার কি হতে পারে, ওটার কি হতে পারে। আর ওর উত্তরে কম্পিটার চিন্তা করলো ১ সেকেন্ড; আর ওর চেয়ে অনেক বেশি চিন্তা করলো। মানুষ কম্পিউটারের সাথে চিন্তা করে কুলাতে পারবে না। তাহলে কি কম্পিউটার মানুষের চেয়ে ভালো? পার্থক্যটা কোথায়?

আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে এমন একটা জিনিস দিয়েছেন, যেটা গরু, ছাগলের মধ্যেও নেই, কম্পিউটারের মধ্যেও নেই; গড়তেও পারবে না- ঐটা হচ্ছে অনুভূতি। যেটাকে আরবিতে হয়তো বলা যেতে পারে শু’ঊর। বাংলায় অনেক গুলো শব্দ ব্যবহার করে; চেতনা, চৈতন্য। ভাল লাগা, খারাপ লাগা, ভাল লাগছে, খারাপ লাগছে, আনন্দ, রাগ ইত্যাদি যে জায়গা থেকে জন্ম হয়, ঐ জায়গা হচ্ছে মানুষের গভীরতম জিনিস।

আর হাত-পা খুব শক্তিশালী, শক্তিশালী দেহ; কিন্তু পাগল বা বোকা- মানুষ হিসেবে সে বড়ই দূর্বল, নিম্নমানের। দৈহিক শক্তিতে খুব প্রসিদ্ধ, চোখে খুব ভালো দেখে, কানে খুব ভালো শোনে কিন্তু বুদ্ধি কাজ করেনা। ভালো মন্দ বুঝেনা, অনুভূতিহীন। তো সে মানুষ হিসেবে ব্যর্থ মানুষ।

একইভাবে খুব চিন্তা করতে পারে, অত্যন্ত মেধাবী, কিন্তু তার কোন অনুভূতি বা ইংরেজীতে Feeling এগুলো নেই। তো বড় বৈজ্ঞানিক, বড় দার্শনিক; তার বুদ্ধির কোন সীমা নেই, কিন্তু বউ ওকে ছেড়ে চলে গেছে।

তাহলে মানুষ কি? হাত দিয়ে ধরতে পারা? এটা মানুষের প্রধান জিনিস নয়। এরচেয়ে মেশিনের শক্তি অনেক বেশি। একটা কুকুরের কামড় অনেক শক্তিশালী। চিন্তা করতে পারা? বর্তমানে কম্পিউটার অনেক বেশি চিন্তা করতে পারে। যদিও চিন্তা করার শক্তি আগে থেকেই তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হয়, শিখাতে হয়। সেটাও কোন আশ্চর্য কথা নয়। মানুষকেও তো চিন্তা শিখাতে হয়। সে ১০-২০ বছর কি পড়েছে? ঐ সফটওয়্যার লোড করা হয়েছে। কম্পিউটারের মধ্যে যে সফটওয়্যার লোড দেওয়া হয়, আধা ঘণ্টার মধ্যে সে নিয়ে নেয়। আর মানুষকে ২০ বছর ধরে শিখাতে হয়। তো সেই হিসেবে মানুষের চেয়ে কম্পিউটারে চিন্তা শক্তি ভালো। কিন্তু অনুভব করতে পারা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা এইটা হচ্ছে মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য বা একমাত্র বৈশিষ্ট্য, যে বৈশিষ্ট্য দিয়ে আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে গোটা সৃষ্টি জগতের মধ্যে আলাদা করেছেন।(মোজাকারা হতে)

করোনা রিস্থিতিতে আমরা দেখেছি, সন্তানেরা তাদের মা’কে ফেলে পালিয়েছে। মৃত বাবার গোসল, জানাজা ও দাফনে শরীক হয় নি তার সন্তানেরা। যে পরিবারের জন্য আপনি সারাজীবন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন, ভাল মন্দ সব কাজই করেছেন আজকে এক লহমায় তারা আপনাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। বাড়িওয়ালা সংক্রমনের ভয়ে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি তার ভাড়াটিয়াকে, কেউ আবার মাত্র এক মাসের ভাড়া না পাওয়ার কারণে দুগ্ধপোষ্য শিশু সহ পুরো পরিবারটিকে রাতের অন্ধকারে বের করে দিয়েছে বাড়ি হতে। আপনার লাশটাও দাফন করতে দিচ্ছেনা এলাকাবাসী। আর অসহায় মানুষের ত্রান আত্মসাত করেছে এক শ্রেনীর ….।

করোনা এই সত্য কথাগুলো স্মরন করিয়ে দিয়ে আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখেছে আসলেই আমরা কি মানুষের সঙ্গার মধ্যে পড়ি?

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিকটা বুঝার তৌফিক দান করুন।(আমিন)

লেখক:ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা।

০১৭১২৩১১৭৮৯

 

 

Check Also

নতুন পাসপোর্টের

করোনা মহামারীর কারণে নতুন পাসপোর্টের অপেক্ষায় লাখো আবেদনকারী

স্টাফ রিপোর্টার:    করোনা মহামারীর কারণে সীমিত আকারে চলতে থাকা পাসপোর্ট অফিসের কার্যক্রম এখনো পুরোদমে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *