Friday , August 14 2020
Breaking News
Home / খবর / করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ৭)” – ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ৭)” – ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

 করোনা হতে আমরা

– ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

 আমার এক বন্ধুর মুরগির ফার্ম ছিল। একদিন কোন কাজে তার বাড়ী গেলাম, দেখলাম বেচারি মুরগির ফার্মের ভিতরে, মুখে সিগারেট, এক হাতে বই, অন্য হাতে মুরগির পরিচর্চা করছে। জিজ্ঞাসা করলাম দোস্ত মুরগির পরিচর্চা এইটা আবার বই দেখে দেখে করার কি প্রয়োজন আছে? বইটা রাখ দুই হাত কাজে লাগাও। দোস্ত খুব গুরুগম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিল। না দোস্ত খুব সেন্সেটিভ বিষয়। একটু এদিক ওদিক হয়ে গেলে অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

 দোস্তকে পরবর্তি প্রশ্ন করলাম, দোস্ত মুরগির পরিচর্চার সময় মুখে একটা সিগারেট থাকবে এটা কি ঐ বই-এ লেখা আছে?

 দোস্ত আমার প্রশ্নে একটু হতচকিত হয়ে গেল, বাধা বাধা কন্ঠে উত্তর, না—-, এটা এমনিই খাচ্ছি।

 প্রিয় পাঠক আমাদের এলাকাতে(মেহেরপুর) তামাকের চাষ হয়। ছেলেবেলায় মাঠের ভিতর দিয়ে যখন হাঠতাম, দেখতাম শাক-সবজির জমিতে বেড়া দেওয়া লাগে কারন গরু-ছাগলে খেয়ে ফেলতে পারে কিন্তু তামাকের জমিতে কখনও বেড়া দেওয়া লাগেনা কারন গরু-ছাগলে ভুল করেও তামাকের পাতায় মুখ লাগায় না। আফসোস গরু-ছাগলে তামাকের পাতা চেনে কিন্তু মানুষ চেনে না।

মুরগির পিছনে মেহনত করার কারণে মুরগির পরিচর্যা বোঝে কিন্তু নিজের পিছনে মেহনত না হওয়ার কারণে নিজের পরিচর্যা বোঝে না।

আমার একটি ঘটনা মনে আছে। দুই ভায়ের বাড়ি পাশাপাশি। এক ভায়ের উঠানে ধান মেলে দেওয়া ছিল। সেই ধান খাচ্ছিল অপর ভায়ের মুরগি। মুরগি তাড়াতে চুলার জ্বালানী কাঠ নিক্ষেপ করল ভায়ের বউ। ভেঙ্গে গেল মুরগির পা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই ভায়ে মারামারি। এক ভাই অপর ভায়ের মাথায় দিল লাঠির বাড়ি। হায়রে! মুরগির দাম বুঝে আসে কিন্তু ভায়ের দাম বুঝে আসে না।

মদের কথায় ধরুন, মদাসক্তির ভয়াবহ পরিণামে মার্কিনসমাজ যখন বিধ্বস্তপ্রায় তখন সেখানে আইন করে মদ নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিলো। সরকার ও তার সমগ্র প্রশাসন সর্বশক্তি নিয়োগ করে মদরিরোধী অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। মদের ক্ষতি ও অপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পত্রপত্রিকায় এবং সিনেমা ও টিভি-পর্দায় বিজ্ঞাপন ও প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে শুরু করে সভা-সেমিনার ও ব্যাপক গণসংযোগ, কোন কিছুই বাদ যায়নি। এক পরিসংখ্যান মতে মদবিরোধী প্রচারণায় মার্কিন সরকার ষাট মিলিয়ন ডলারেরও বেশী ব্যয় করেছিলো এবং প্রকাশিত বইপত্র ও পুস্তক-পুস্তিকার পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিলো দশ বিলিয়ন। তাছাড়া মদনিষিদ্ধ আইন কার্যকর কারার পিছনে সুদীর্ঘ চৌদ্দ বছরে সরকারকে  দু’শ পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছিলো। আইনের প্রয়োগ এত কঠোর ছিলো যে, তিনশ ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিলো, আর কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো পাঁচ লাখ বত্রিশ হাজার তিনশ পঁয়ত্রিশ ব্যক্তিকে। অর্থ-জরিমানার পরিমাণ ছিলো ষোল মিলিয়ন ডলার এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির পরিমাণ ছিলো চারশ চার মিলিয়ন ডলার। কিন্তু এত কিছুর পরো দেখা গেলো, মার্কিন জাতির মদাসক্তি বেড়েই চলেছে। জীবনের মূল্যেও তারা মদের পেয়ালা ছাড়তে রাজি নয়। শেষ পর্যন্ত মার্কিন সরকারকে নতি স্বীকার করতে হলো এবং ১৯৩৩ সালে মদবিরোধী আইন তুলে নিয়ে ঘোষনা দিতে হলো, এখন থেকে মার্কিন মুল্লুকে মদ নিঃশর্তভাবে বৈধ।(মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হল)

আমেরিকার একজন বড় ব্যবসায়ীর জীবনের টার্গেট ছিল সে একটি দশতালা বাড়ী বানাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাড়ী বানানোর কাজ শেষ হলো। এখন আর তার জীবনের কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। চিন্তা করল তাহলে আর বেঁচে থেকে কি লাভ? বাড়ীটি তার কুকুরের নামে উইল করে দিল। পুলিশকে খবর দিল সে আত্মহত্যা করবে, পুলিশ আসল, সে দশ তলার উপর হতে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এক জন মানুষ আত্মহত্যা করছে। যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় বেশি বলে দাবি করেছেন গবেষকরা। সবশেষ ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ব্রিটেনে ১৪৬ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত আত্মহত্যার হার কমলেও ২০০৭ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ৫৬ শতাংশ বেড়ে যায়।(ইনকিলাব)

এতো পিছনের কথা। আর করোনা পরিস্থিতিতে লক ডাউন চলা অবস্তায় আমরা লক্ষ্য করেছি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রচুর পরিমানে বেড়ে গেছে মাদকাসক্তি ও আত্যহত্যার পরিমান। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লক ডাউন তুলে নেওয়ার কারণ সম্পর্কে বলেছেন, লক ডাউন দিয়ে কি লাভ কারণ ঘরে থেকে বেড়ে যাচ্ছে প্রচুর পরিমানে মাদকাসক্তি ও আত্যহত্যার পরিমান। কে না তার নিজের জীবনকে ভালবাসে? এতটা প্রাচুর্য, বিলাসিতা আর স্বাচ্ছন্দ্য। কোন কিছুরই অভাব নেই এরপরও নিজের জীবনের প্রতি ভালবাসা নেই।

 ক্ষমতার পিছনে প্রচুর মেহনত হয়েছে ফলে ক্ষমতা সুসংহত হয়েছে আর আমি বেদামি হয়ে গেছি।

 সম্পদের পিছনে প্রচুর মেহনত হয়েছে ফলে সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে আর আমি বেদামি হয়ে গেছি।

 প্রযুক্তির পিছনে প্রচুর মেহনত হয়েছে ফলে প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে আর আমি বেদামি হয়ে গেছি।

 ডিগ্রীর পিছনে প্রচুর মেহনত হয়েছে ফলে ডিগ্রী অনেক উন্নত হয়েছে আর আমি বেদামি হয়ে গেছি।

 চাকুরীর পিছনে প্রচুর মেহনত হয়েছে ফলে চাকুরীর মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে আর আমি বেদামি হয়ে গেছি।

 ব্যবসার পিছনে প্রচুর মেহনত হয়েছে ফলে ব্যবসা উন্নত হয়েছে আর আমি বেদামি হয়ে গেছি।

 আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

 মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিকটা বুঝার তৌফিক দান করুন।(আমিন)

লেখক:- ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা

০১৭১২৩১১৭৮৯

Check Also

মোল্লাহাটে

মোল্লাহাটে সাবেক স্ত্রী’র চাচাতো ভাইকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ

    মিয়া পারভেজ আলম   মোল্লাহাট প্রতিনিধি :    বাগেরহাটের মোলস্নাহাটে সাবেক স্ত্রীর চাচাতো ভাইকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *