Tuesday , August 4 2020
Breaking News
Home / বাংলাদেশ / করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ৬):ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ৬):ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

 করোনা হতে

 আবূ হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত রসূলাল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘সংক্রমনের অস্তিত্ব নেই’। তখন এক বেদুঈন বলল, হে আল্লাহর রসূল, আমার উটগুলো হরিনীর ন্যায় সুস্থ থাকে। এরপর একটি চর্মরোগে আক্রান্ত উট এগুলোর মধ্যে প্রবেশ করার পরে অন্যান্য উটও আক্রান্ত হয়ে যায়। তখন রসূলাল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে প্রথম উটটিকে কে সংক্রমিত করল?’(বুখারী)

 সংক্রমনের অস্তিত্ব নেই’ এ কথাটির দ্বারা ইসলাম বিদ্বেষীরা রসূলাল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসটিকে ভুল প্রমানিত করতে চেয়েছে।  তারা বলতে চেয়েছে, রোগের জীবাণু সংক্রমিত হবার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ইসলাম অস্বীকার করেছে।

 লক্ষ্য করুন, একাধিক হাদীসের ভিতরে সংক্রমনের বিষয়ে সতর্ক হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রসূলাল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘অসুস্থকে সুস্থের মধ্যে নেয়া হবে না(রুগ্ন উট সুস্থ উটের কাছে নেবে না)।’(বুখারী)

 অপর এক হাদীসে রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘…কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাকো, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাকো।’(বুখারী)

 ওমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ের একটি ঘটনা বর্ণিত আছে, একজন কুষ্ঠরোগী মহিলা যে বাইতুল্লার তওয়াফ করছিল। হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু ঐ মহিলার নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাকে দেখে ফেললেন। তিনি মহিলাটিকে বললেন, হে আল্লাহর বান্দী, লোকদরেকে কষ্ট দিও না, তুমি যদি নিজের ঘরে বসে থাক তবে ভাল হয়। উক্ত মহিলা হারাম শরীফে আসা বন্ধ করে দিল এবং নিজ ঘরে বসে থাকল।(হায়াতুস সাহাবাহ)

 এক হাদীসে রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যদি তোমরা শুনতে পাও যে, ‘কোনো জনপদে প্লেগ বা অনুরূপ মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে তবে তোমরা তথায় গমন করবে না। আর যদি তোমরা যে জনপদে অবস্থান করছ তথায় তার প্রাদুর্ভাব ঘটে তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না।’(বুখারী)

 একবার হযরত ওমর ফারূক রাযিয়াল্লাহু আনহু শাম অর্থাৎ বর্তমানের সিরিয়া সফরে যাচ্ছিলেন। পথে সংবাদ পেলেন, শাম অঞ্চলে মহামারি আকারে প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এত জটিল রূপ ধারণ করেছে যে, রোগটি দেখা দেওয়া মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে বহু মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সঙ্গীদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন, এই পরিস্থিতিতে ওখানে যাবেন, নাকি ফিরে যাবেন। তখন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু উক্ত হাদীসটি শোনালেন। এই হাদীসে রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, যেখানে মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটবে সেখানে যেন আমরা না যাই। তাই হযরত ওমর ফারূক রাযিয়াল্লাহু আনহু শাম সফর মুলতবি করে দিলেন।(বুখারী, মুসলিম)

 অর্থাৎ এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, রোগের জীবাণু সংক্রমিত হবার প্রাকৃতিক এ প্রক্রিয়া ইসলামে উপেক্ষিত হয়নি। এ প্রক্রিয়া যদি ইসলামে অস্বীকার করা হত, তাহলে, কেন রোগাক্রান্ত উটকে সুস্থ উটের কাছে আনতে নিষেধ করা হল? আর কেনইবা কুষ্ঠ রোগীর থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হল? আর কেনইবা যেখানে মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে সেখানে যেতে নিষেধ করা হল? আসল কথা হল, রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘সংক্রমনের অস্তিত্ব নেই’ এ কথার দ্বারা তিনি রোগ-জীবানুকে নফি করেছেন। অর্থাৎ এই সমস্ত রোগ জীবানু নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি, একে আল্লাহ তা’য়ালা নিজের কুদরতের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে রোগ সৃষ্টির যে গুন আছে তা তার নিজের নয়, এই গুন আল্লাহ তা’য়ালার দেওয়া। আর তার এই গুন প্রকাশ করার জন্যও সে আল্লাহর ইচ্ছার(কুদরতের) উপর নির্ভরশীল, সে নিজে কিছুই করতে পারে না।

 এখানে খুব ভাল ভাবে বুঝে নিতে হবে, জীবাণু সংক্রমিত হওয়া মানেই রোগ সংক্রমিত হওয়া নয়। যেমন, করোনা ভাইরাসের কথায় ধরুন। এই ভাইরাস একজনের শরীর হতে অন্যজনের শরীরে চলে যেতে পরে কিন্তু তার শরীরে গিয়ে সে ক্রিয়া করবে কি না করবে বা কতটুকু ক্রিয়া করবে এটা আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আমরা লক্ষ্য করে থাকব, ত্রিশ বছর বয়সের টকবগে যুবক করোনাতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরন করেছে আবার একশত পনের বছরের বৃদ্ধা করোনা দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে গেছে। আবার অনেকে সংক্রমিত হওয়ার পরও তাদের শরীরে কোন প্রকার রোগের লক্ষণই দেখা যায় নি। আবার লক্ষ্য করুন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সুরক্ষিত ঘরবাড়ির, উন্নত খাবার, উন্নত চিকিৎসা, উন্নত ব্যবস্থাপনা ও উচ্চ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ভিতরে লক্ষ লক্ষ মানুষ করোনা দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে বিপরীতে গরীব দেশগুলোর রাস্থার ধারে, রেল স্টেশান ও বাস স্টেন্ডে বসবাসরত অনাহারে অর্ধাহারে থাকা নিম্ন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন পাগোল, টোকাই বা অসহায় মানুষগুলো করোনা দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করার খবর তেমন পাওয়া যায় না। অর্থাৎ করোনা দ্বারা সংক্রমিত হলেই যে সে রোগাক্রান্ত হবে বা মৃত্যুবরণ করবে এমনটি নয় এটা আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।

 আর একারণেই রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তাহলে প্রথম উটটিকে কে সংক্রমিত করল? প্রথম উটের উপরে সংক্রামক ব্যতীত আল্লাহর ইচ্ছাতেই রোগ নাযিল হয়েছে। প্রথম উটটি রোগাক্রান্ত হওয়ার পিছনে আল্লাহর নির্ধারণ ব্যতীত অন্য কোন কারণ নেই। দ্বিতীয় উটটি রোগাক্রান্ত হওয়ার কারণ যদিও জানা যাচ্ছে, তথাপি আল্লাহ চাইলে রোগাক্রান্ত হত না। তাই কখনো রোগাক্রান্ত হয় এবং পরবর্তীতে ভালোও হয়ে যায়। আবার কখনো মারাও যায়।

অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছাতেই রোগের জীবাণু নাজিল হয়, আল্লাহর ইচ্ছাতেই অসুস্থ ব্যক্তির নিকট থেকে সুস্থ ব্যক্তির নিকট গমণ করে এবং আল্লাহর ইচ্ছাতেই ক্রিয়া করে।

 আর একটি বিষয় ছিল, সেটি সামাজিক। সে সময়ে আরবদের ভিতরে বিভিন্ন প্রকার কুলক্ষণ, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। তৎকালিন আরবে একটি কুপ্রথা চালু ছিল সেটা হল, কেউ রোগাক্রান্ত হলে সংক্রমনের ভয়ে তাকে ঘরের বাইরে ফেলে রাখা হত বা আনেক দুরে রেখে আসা হত। যে ঘটনাটি আমরা করোনার ক্ষেত্রেও দেখেছি পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এমন কী চিকিৎসা সেবীরাও সংক্রমনের ভয়ে করোনা আক্রান্ত রুগীকে ফেলে পালিয়েছে। এই রকম অমানবিকতাকে ইসলাম সমর্থন করেনি। ইসলাম এই আদর্শকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে যে, জীবাণু সংক্রমিত হওয়া মানেই রোগ সংক্রমিত হওয়া নয়। অসুস্থ অসহায় মানুষকে সংক্রমনের ভয়ে ফেলে রেখে যাওয়া চলবে না, তাদের সেবা দিতে হবে। অর্থাৎ ‘সংক্রমনের অস্তিত্ব নেই’ একথার দ্বারা রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করেছেন।

 এই ক্ষুদ্রতি ক্ষুদ্র অনুজীব করোনা সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে বর্ণিত রসূলে করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথার সত্যতাকে স্মরন করিয়ে দিয়ে আমাদেরকে অবিভুত করেছে।  হাদিসের বক্তব্য থেকে যারা ভুল বের করার চেষ্টা করে, তাদের উদ্যেশ্য আবারও ব্যর্থ হল।

 আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিকটা বুঝার তৌফিক দান করুন।(আমিন)

লেখক:ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা

 ০১৭১২৩১১৭৮৯

Check Also

গাংনীতে প্রেমিকার সাথে

গাংনীতে প্রেমিকার সাথে অভিমানে সেনা সদস্য’র বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা

আমিরুল ইসলাম অল্ডাম : মেহেরপুরের গাংনীতে প্রেমিকার সাখে অভিমানে এক সেনা সদস্য বিষপানে আত্মহত্যার অপচেষ্টা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *