Thursday , August 13 2020
Breaking News
Home / খবর / সদরঘাটে মর্মান্তিক লঞ্চডুবি ৩৬ লাশ উদ্ধার

সদরঘাটে মর্মান্তিক লঞ্চডুবি ৩৬ লাশ উদ্ধার

lons

স্টাফরিপোটার :  কালের মর্মস্পর্শী যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীর সদরঘাট শ্যামবাজার এলাকায়। এর আগে বুড়িগঙ্গায় এত বড় লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেনি। গতকাল মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ড লঞ্চটি সদরঘাটে নোঙ্গর করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক ওই সময় ঘাট থেকে বের হওয়া ময়ূর-২ নামের লঞ্চটি ধাক্কা দিয়ে মর্নিং বার্ডের উপরে উঠে যায়। এতে সঙ্গে সঙ্গে মর্নিং বার্ড ডুবে যায়। ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রীদের কয়েকজন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন।

এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৬ জনের লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। তবে নারী ও শিশুসহ এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত রাজধানীর মিডফোর্ড হাসপাতাল থেকে ৩২ জনের লাশ শনাক্ত করেছেন স্বজনরা। গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত পরিচয় মিলেছে ৩০ মরদেহের। রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিখোঁজ অন্যদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও কোস্ট গার্ড। এদিকে এ লাশগুলো হস্তান্তর করা হচ্ছে বলে জানান মর্গে দায়িত্বরত এসআই ফজিকুল ইসলাম।

ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা রোজিনা ইসলাম বলেন, সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ দুর্ঘটনার খবর জানার পর তাদের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও বিআইডবিস্নউটিএ’র কর্মীরাও সেখানে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন।

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ঘটনায় ৩০ জন মরদেহের পরিচয় মিলেছে। তারা হলেন- ১. সত্যরঞ্জন বনিক (৬৫), ২. মিজানুর রহমান (৩২), ৩. শহিদুল (৬১), ৪. সুফিয়া বেগম (৫০), ৫. মনিরুজ্জামান (৪২), ৬. সুবর্ণা আক্তার (২৮), ৭. মুক্তা (১২), ৮. গোলাম হোসেন ভুইয়া (৫০), ৯. আফজাল শেখ (৪৮), ১০. বিউটি (৩৮), ১১. ছানা (৩৫), ১২. আমির হোসেন (৫৫), ১৩. মো. মহিম (১৭), ১৪. শাহাদাৎ (৪৪), ১৫. শামীম ব্যাপারী (৪৭), ১৬. মিল্লাত (৩৫), ১৭. আবু তাহের (৫৮), ১৮. দিদার হোসেন (৪৫), ১৯. হাফেজ খাতুন (৩৮), ২০. সুমন তালুকদার (৩৫), ২১. আয়শা বেগম (৩৫), ২২. হাসিনা রহমান (৪০), ২৩. আলম বেপারী (৩৮), ২৪. মোসা. মারুফা (২৮), ২৫. শহিদুল হোসেন (৪০), ২৬. তালহা (২),

২৭. ইসমাইল শরীফ (৩৫), ২৮. সাইফুল ইলাম (৪২), ২৯. তামিম ও ৩০. সুমনা আক্তার। ফায়ার সার্ভিস কন্ট্রোল রুমের ডিউটি অফিসার রোজিনা আক্তার জানান, সোমবার সকালে আরেকটি লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা লেগে লঞ্চটি ডুবে যায়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৮ নারী ও ৩ শিশুসহ ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩০ জনের পরিচয় মিলেছে। তবে এখনও ঠিক কতজন নিখোঁজ রয়েছেন, সেটাও স্পষ্ট নয়। ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও বিআইডবিস্নউটিএ’র কর্মীরাও উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন।

সদরঘাট নৌ থানার ওসি রেজাউল করিম ভূঁইয়া জানান, লাশগুলোর ময়নাতদন্তের জন্য মিটফোর্ড হাসপাতলে নেয়া হবে।

ছুটে আসা স্বজনদের আহাজারিতে শ্যামবাজার এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে যায়। নেমে আসে শোকের ছায়া। ডুবে যাওয়া লঞ্চ মর্নিং বার্ড উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ধাক্কা লাগা লঞ্চ ময়ূর-২ আটক করা হয়েছে। এই লঞ্চ দুর্ঘটনায় নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এদিকে দুর্ঘটনার পর থেকে দিনভর উদ্ধার কাজের খোঁজখবর রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গতকাল সোমবার সকাল ৯টার দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর শ্যামবাজারের কাছে এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্বজনরা জানিয়েছেন, নিহতরা সবাই মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা। তারা ঢাকায় চাকরি ও ব্যবসা করতেন। তারা ঢাকায় থাকতেন না। কর্মের জন্য তারা প্রতিদিন সকালে লঞ্চে ঢাকায় আসতেন এবং কাজ শেষে রাতে আবার লঞ্চে মুন্সিগঞ্জে ফিরতেন। সাক্ষাৎ মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়া আবদুর রউফসহ কয়েকজন জানান, তারা লঞ্চ থেকে ঘাটে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এসময়ই ঘটে দুর্ঘটনা।

দুর্ঘটনা : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ১০০ জনের অধিক যাত্রী নিয়ে এমভি মর্নিং বার্ড মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে সকাল ৮টার দিকে সদরঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। সদরঘাটের কাছাকাছি শ্যামবাজারে পৌঁছালে চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ সজোরে ধাক্কা দিয়ে মর্নি বার্ডের উপর উঠিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে তুলনামূলক ছোট মর্নিং বার্ড লঞ্চটি পানিতে তলিয়ে যায়। কয়েকজন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও বাকিদের সলিল সমাধি ঘটে। ডোবার সময় লঞ্চের ভেতরে তীব্র আর্তচিৎকার শোনা যায়।

বিআইড?বিস্নউ?টিএ’র যুগ্ম প?রিচালক ঢাকা নদী বন্দর কর্মকর্তা একেএম আরিফ উদ্দিন বলেন, মর্নিং বার্ড লঞ্চটি সকাল ৯টার দিকে সদরঘাটে বা?র্দিং (নোঙ্গর) করার আগ মুহূর্তে চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ লঞ্চটি ধাক্কা দেয়। এতে সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলক ছোট মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। এ সময় লঞ্চটিতে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক যাত্রী ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে কয়েকজন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন। তবে ঠিক কতজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তিনি জানান, ঘটনার পর পরই ময়ূর লঞ্চটি আটক করা হয়েছে।

ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছেন মর্নিং বার্ডের যাত্রী রউফ। কীভাবে লঞ্চটি ডুবে গেল, সে ব্যাপারে আবদুর রউফ বলেন, ‘লঞ্চটি সদরঘাটের একেবার কাছে চলে আসে। আমরা নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ করে ঘাটের খালি একটি লঞ্চ আমাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। ভয়ে আমরা সবাই চিৎকার দিই। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে আমাদের লঞ্চটি উল্টে যায়। আমরা ছিলাম লঞ্চের নিচের তলায়। পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকি। দম আমার বের হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি পানির ওপরে উঠতে পারি। বেঁচে যাই। কিন্তু আমার বন্ধু সত্যরঞ্জন উঠতে পারেনি, সে মারা গেছে।

আবেগাপ্লুত আবদুর রউফ জানান, লঞ্চের যারা মারা গেছেন বা ডুবে গেছেন, তাদের অনেককে তিনি ভালো করে চেনেন। কারণ এসব মানুষ মুন্সিগঞ্জ থেকে প্রতিদিন ঢাকায় আসেন। কাজ শেষে আবার মুন্সিগঞ্জে চলে যান। আবদুর রউফ বলেন, আমাদের লঞ্চটতে ৭০ থেকে ১০০ জন যাত্রী ছিল। নিয়ম মেনে ঘাটে ভেড়াচ্ছিল। হঠাৎ করে অন্য লঞ্চটি ধাক্কা দিয়ে এই মানুষগুলোকে মেরে ফেলল। আমিও মরে যেতে পারতাম।

তবে স্থানীয়দের দাবি, লঞ্চে শতাধিক যাত্রী ছিল। যা ধারণ ক্ষমতার অধিক। এছাড়া ছোট এ লঞ্চটি দীর্ঘদিনের পুরানো এবং ফিটনেস নেই। ময়ূর লঞ্চটি নির্মাণেও ত্রুটি রয়েছে।

দুর্ঘর্টনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও কোস্ট গার্ড। পরে উদ্ধার কাজে যোগ দেয় নৌবাহিনী। এছাড়া নৌপুলিশ এবং বিআইডবিস্নউটিএ’র নিজস্ব ডুবুরি দল এবং স্থানীয় লোকজন উদ্ধারকাজে অংশ নেয়।

উদ্ধারকাজে অংশ নেয়া ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানান, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার কাছাকাছি এলাকায় নদীর মাঝখানে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি শনাক্ত করা হয়েছে। ভেতরে আর কারও লাশ আছে কি না, তা তল্লাশি করে দেখা হচ্ছে। ডুবুরিরা দেখেছেন লঞ্চটির ভেতর আরও মৃতদেহ রয়েছে। তবে তা উদ্ধার কঠিন হয়ে পড়েছে। কেননা, লঞ্চটি উপুড় হয়ে থাকার কারণে ভেতরে ঢোকা যাচ্ছে না।

কোস্ট গার্ড সদর দফতরের মিডিয়া উইং এর কর্মকর্তা লে. কমান্ডার হায়াৎ ইবনে সিদ্দিক ও ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ম্যানেজার শহীদুল ইসলাম সুমন জানান, এখন পর্যন্ত ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজন শিশু, পাঁচ জন নারী, ২৩ জন পুরুষের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা আরো বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সন্দেহ থাকবে এখনও মরদেহ থাকতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোস্ট গার্ডের উদ্ধার অভিযান চলবে। প্রায় ৬০-৭০ ফুট পানির তলদেশে লঞ্চটি কাত হয়ে স্থিতিশীল রয়েছে। আমাদের সঙ্গে নৌপুলিশ, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বিআইডবিস্নউটি ও থানা পুলিশ কাজ করছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিস্নউটিএ) নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধারে সংস্থার নিজস্ব উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর থেকে সকাল ১১টায় রওনা দিয়েছে। তবে এক নম্বর বুড়িগঙ্গা সেতুর উচ্চতার কারণে উদ্ধারকারী জাহাজটি ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়নি।

শ্যামবাজার ও মিডফোর্টে কান্নার রোল : দুর্ঘটনার পর হাজার হাজার মানুষ ঘাটে এসে ভিড় করেন। খবর পেয়ে শ্যামবাজার এলাকায় ছুটে আসেন যাত্রীদের স্বজনরা। কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। তাদের আহাজারিতে বুড়িগঙ্গার বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। লঞ্চ দুর্ঘটনায় নদী তীরে ভিড় জমানো লোকজনের মাঝেও নেমে আসে শোকের ছায়া। নিখোঁজ যাত্রীদের খোঁজে ঘাটে আসা স্বাজনদের বিলাপ করতে দেখা যায়। অনেক স্বজনকে দেখা যায় নদীতে সাঁতার দিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ারও চেষ্টা করতে। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশসহ অভিযান পরিচালনা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়।

ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা যেসব লাশ উদ্ধার করেছেন, তাদের মধ্যে যমুনা ব্যাংকের ইসলামপুর শাখার কর্মচারী সুমন তালুকদারকে শনাক্ত করেন তার বড় ভাই নয়ন তালুকদার। তিনি জানান, তাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমে। প্রতিদিন বাড়ি থেকে এসে পুরান ঢাকার ইসলামপুরে অফিস করতেন সুমন।

নিহত মৃত মনিরুজ্জামানের বড় ভাই আব্দুস সালাম বলেন, মনির ইসলামপুরে একটি কাপড়ের দোকানে চাকরি করে। প্রতিদিন মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা-যাওয়া করে। আজও (গতকাল) ফজরের নামাজ পড়ে ঢাকায় রওনা দেয়। তাদের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার সালিমাবাদ থানার আব্দুল্লাপুর।

পরিবারের চার-পাঁচজনও এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন। প্রিয়জনদের মৃতদেহ পাওয়ার জন্য তাদের ভিড় এখন ঢাকার বুড়িগঙ্গা পাড়ে।

ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রীদের এক স্বজন বলেন, লঞ্চডুবির ঘটনায় আমার চাচি, চাচাতো ভাই ও বড় ভাই নিখোঁজ রয়েছেন। খবর পেয়ে আমি মুন্সীগঞ্জ থেকে ছুটে এসেছি। তবে এখনও তাদের সন্ধান পাইনি।

ঢাকায় ডাক্তার দেখাতে সকালে মুন্সীগঞ্জ থেকে তার আত্মীয়রা মর্নিং বার্ড লঞ্চে উঠেছিলেন বলে জানান তিনি। আরেক স্বজন বলেন, আমার মামাতো বোন ও তার দুই সন্তান নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের সন্ধানে আমি এসেছি। তিনি বলেন, আমার মামাতো বোন পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন। গ্রামের বাড়ি থেকে সন্তানদের নিয়ে তারা ঢাকায় ফিরছিলেন।

রাজ্জাক নামে একজন বলেন, তার বোনজামাই মুন্সীগঞ্জ থেকে সকালে ঢাকায় আসার কথা। এখনও তার কোনো সন্ধান পাননি। সিদ্দিক নামে এক যুবক বলেন, তার মামা কালাম নিখোঁজ। তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এদিকে মৃতদেহ উদ্ধারের পর রাখা হয়েছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডকেল কলেজ ও হাসপাতালের (মিডফোর্ট) মর্গে। শনাক্ত করার পর এখান থেকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় মৃতদেহ। মৃতদেহ শনাক্ত ও নেয়ার জন্য স্বজনরা অপেক্ষা করছেন মিডফোর্টে। এখানে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিআইডবিস্নউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক সাংবাদিকদের বলেন, দুই লঞ্চের কর্মীদের অসতর্কতায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে তারা মনে করছেন। উদ্ধার অভিযান শেষে এ বিষয়ে তদন্ত শুরু হবে।

উদ্ধার কাজের খোঁজ রাখেন প্রধানমন্ত্রী : বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবিতে উদ্ধার কাজের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

মৃতদেহ দাফন-সৎকারে আর্থিক সহায়তা : লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহতদের দাফন-সৎকারের জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বিআইডবিস্নউটিএ থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। কেরাণীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, মৃতদেহ দাফন বা সৎকারের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ঢাকা জেলা প্রশাসন থেকে ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বিআইডবিস্নউটিএ থেকে প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা প্রদান করা হচ্ছে। স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হচ্ছে।

তদন্ত কমিটি : শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। কমিটির প্রধান হলেন নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন ও পিপিপি সেল) মো. রফিকুল ইসলাম খান। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেরনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেছেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ চলছে। উদ্ধার তৎপরতা শেষে ফায়ার সার্ভিস আলাদা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবে।

নদীর তলদেশে লঞ্চটি উল্টে আছে : বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাওয়া লঞ্চটি নদীর তলদেশে উপুড় হয়ে আছে। ভেতরে কত জনের লাশ আছে তা বোঝা যাচ্ছে না এখনও। শেষ ৭-৮টি মরদেহ ডুবে থাকা লঞ্চটির আশপাশে ভাসমান অবস্থায় পেয়েছেন ডুবুরিরা। গতকাল সোমবার দুপুরে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ডুবুরিদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়। বিআইডবিস্নউটিএ’র হয়ে কাজ করছেন ডুবুরি জাহাঙ্গীর আলম শিকদার। ৯টি মরদেহ লঞ্চ থেকে উদ্ধার করেছেন তিনি। তিনি বলেন, আমি সকাল ১০টার দিকে খবর পেয়ে এখানে আসি। এসে দেখি ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ড্রাইভে রয়েছে। আমাকে তারা কাজ করতে বললো। এরপর আমি নামলাম। লঞ্চটি ৬০-৭০ ফুট পানির নিচে কাত হয়ে রয়েছে। একটু তল্লাশি করার পরই দু’টি মরদেহ পেলাম। এরপর আবার যখন যাই তখন দেখি লঞ্চটি উপুড় হয়ে আছে। এরপর একে একে শিশুসহ আরও সাতটি মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে আসি। এর মধ্যে দু’জন নারী রয়েছে। আরেক বেসরকারি ডুবুরি মো. কালু ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি বলেন, পানির নিচে লঞ্চটি উপুড় হয়ে আছে। আমি দু’টি লাশ লঞ্চের বাইরে পেয়েছি। ধারণা করছি কিছু লাশ হয়তো বের হয়েছে। নজরুল ইসলাম নামে আরেক ডুবুরি বলেন, আমি দুটি লাশ উদ্ধার করেছি। ভেতরে আর লাশ দেখলাম না। তবে লঞ্চটি উপুড় হয়ে রয়েছে, অন্য কোথাও লাশ থাকতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ম্যানেজার শহীদুল ইসলাম সুমনা ঘটনাস্থলে লাশ গ্রহণ ও লাশ তীরে হস্তান্তর করছেন। তিনি বলেন, আমাদের ডুবুরিরা কাজ করছেন। সব প্রতিষ্ঠান মিলে কাজ করছে। অভিযানের শেষ পর্যন্ত আমরা কাজ করবো। বিআইডবিস্নউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় এখনও ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছাতে পারিনি। জাহাজটি পোস্তগোলা ব্রিজের কাছ পর্যন্ত এসে আর আসতে পারছে না। প্রসঙ্গত, সোমবার সকালে মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ছোট্ট দোতলা লঞ্চ মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দেয় ময়ূর-২ নামে আরেকটি লঞ্চ। এখন পর্যন্ত নারী, শিশুসহ ৩০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

চালক পলাতক : রাজধানীর শ্যামবাজারে বুড়িগঙ্গা নদীতে একটি লঞ্চের ধাক্কায় শতাধিক যাত্রী নিয়ে আরেকটি লঞ্চ ডুবে গেছে। গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ পর্যন্ত ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ পুরুষ, ৫ নারী ও দুটি শিশু রয়েছে। ডুবে যাওয়া লঞ্চটির অবস্থান নিশ্চিত করেছে ডুবুরি দল। স্থানীয়রা জানান, মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা দুইতলা মর্নিংবার্ড লঞ্চটি ঘাটে ভেড়ার আগ মুহূর্তে, চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ লঞ্চের সাথে ধাক্কা লাগে। এতে মর্নিংবার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। এ সময় অনেক যাত্রী সাঁতরে পাড়ে উঠতে পারলেও বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে কাজ করছে কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। রয়েছে নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা। ধাক্কা দেয়া ময়ূর-২ লঞ্চ জব্দ করা হলেও পলাতক চালক। নারায়ণগঞ্জ থেকে রওনা হয়েছে বিআইডবিস্নউটিএ এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মহলের শোক : বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবিতে হতাহতের ঘটনায় গতকাল সোমবার গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতি লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মার মাগফেরাত ও শান্তি কামনা করেন ও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। ঢাকার শ্যামবাজার এলাকায় ১৫০ জনের অধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবির ঘটনায় গতকাল সোমবার ছয়জন নারী ও তিনটি শিশুসহ কমপক্ষে ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সদরঘাট নৌ থানার ওসি রেজাউল করিম ভূঁইয়া মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মরদেহগুলোর ময়নাতদন্তের জন্য মিটফোর্ড হাসপাতলঞ্চডুবিলে নেয়া হয়। এ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে গতকাল একটি যাত্রীবাহী লঞ্চডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এ ছাড়া বুড়িগঙ্গায় যাত্রীবাহী লঞ্চডুবে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক জানিয়েছেন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট আরও অনেকে।

গতকাল সোমবার পৃথক পৃথক শোকবার্তায় লঞ্চডুবিতে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন নৌ-পরিবহণ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ ও নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী। এছাড়া লঞ্চডুবিতে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং মহাসচিব (অব.) মেজর আবদুল মান্নান।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ৫০ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ময়ূর-২ নামের লঞ্চের ধাক্কায় কমপক্ষে ৫০ যাত্রী নিয়ে ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ রুটের মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। শেষ খবর পওয়া পর্যন্ত ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

 

লঞ্চডুবি

 

Check Also

ইলিশ

জালে ধরা পড়েনি ইলিশ জেলে মহাজনদের মাথায় হাত

শরণখোলা (বাগেরহাট) থেকে মেহেদী হাসান :    ৬৫ দিনের অবরোধ শেষে সাগরে গিয়ে অনেকেই ফিরেছেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *