Friday , August 14 2020
Breaking News
Home / আরও... / করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ১):- ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

করোনা হতে আমরা যা শিখলাম (পর্ব ১):- ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন

অবিশ্বাসিদের একটা সাধারণ যুক্তি হল ‘যা দেখা যায়না তার অস্তিত্ব নেই’। যাকে অভিজ্ঞতাবাদ বলা হয়ে থাকে। যেখানে অভিজ্ঞতাই যাবতীয় জ্ঞানের উৎস অর্থাৎ আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয় তথা দেখা, শোনা, স্পর্শ, স্বাদ এবং গন্ধ এর বাইরে জ্ঞানের কোন উৎস নেই। কিন্তু আমাদের জীবনে অনেক কিছু আছে যা অভিজ্ঞতা বাদ দ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। ধরুন আজ আপনি বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে তাড়াহুড়োর কারনে সবকিছু এলোমেলো ভাবে রেখে গেছেন, কোন কিছু গুছিয়ে রেখে যেতে পারেননি। কিন্তু আপনি দিন শেষে ঘরে ফিরে অবাক হয়ে দেখতে পেলেন আপনার ঘর খুব সুন্দর করে সাজানো গোছানো! কেউ এসে যে আপনার ঘরকে সাজিয়েছেন সেটা বিশ্বাস করার জন্য কি যে আপনার ঘরকে সাজিয়েছেন তাকে দেখাটা জরুরি? অবশ্যই না? অর্থাৎ না দেখেই সাজানো গোছানো ঘর থেকে আমরা যে ঘরকে সাজিয়াছেন তার অস্তিত্বের প্রমাণ পাই। সুতরাং ‘যা দেখা যায়না তার অস্তিত্ব নেই’ কথাটা যুক্তি সংগত নয়।(আল্লাহর অস্তিত্ত্বের কিছু প্রমাণ)

ইমাম গাযযালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অনেকে একথা ভেবে বিস্মিত হয় যে, যে বস্তুর আকার-আকৃতি নেই তা কিভাবে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে? তারা যদি নিজের রুহ্ সম্বন্ধে চিন্তা করে তাহলে স্পষ্টই বোঝা যায় যার কোনো আকার-আকৃতি নেই। মানুষ নিজের মধ্যে অনুসন্ধান করলে হাজার রকমের আকার-আকৃতিবিহীন বস্ত্ত দেখতে পাবে যেমন, বেদনা, ক্রোধ, প্রেম, আস্বাদ ইত্যাদি হাজার রকমের নিরাকার বস্তু তার মধ্যে আছে। অথচ এই এগুলো কি, কেমন, কত প্রকার- জানতে চেলে সে কখনও তা জানতে পারবে না। কারণ, এগুলোর বর্ণ বা আকার কিছুই নেই। যদি প্রশ্ন করা হয় বেদনার আকার কেমন? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে না, অথচ তার অস্তিত্ব আছে। এছাড়া আরও এমন বহু বস্ত্ত আছে যেখানে ‘কেমন?’ ও ‘কি প্রকার’? প্রশ্ন করা চলে না। শত চেষ্টা করলেও শব্দ, আস্বাদ বা গন্ধের মূলতত্ত্ব কেউই জানতে পারবে না। কারণ, ‘কেমন?’ কি প্রকার?’ প্রশ্নগুলি খেয়ালের অধীন। দর্শনেন্দ্রিয়ের সাহায্যে ছাড়া তা অবগত হওয়া যায় না। সুতরাং বস্ত্তটি ‘কেমন? কি প্রকার?’ এই সকল প্রশ্নের উত্তর একমাত্র দর্শনের পর খেয়ালে সঞ্চিত জ্ঞান হতেই দেওয়া যেতে পারে। যে বস্তুর উপর কানের অধিকার আছে তাতে চোখের কোন অধিকার নেই; যেমন কান শোনে, চোখ শোনে না। বরং শব্দের প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব নয়। কারণ, কান দিয়ে যেমন বর্ণ ও আকৃতি বোঝা যায় না। চোখ দিয়েও তদ্রূপ শব্দ বুঝা যায় না। এইরূপ, যে বস্ত্ত অন্তরে অনুভূত হয় এবং বুদ্ধিতে বুঝা যায়, বাহ্যিক ইন্দ্রিয়গুলি তা অনুভব করতে ও বুঝতে পারে না। চোখ, কান দিয়ে কেবল জড়পদার্থের আকার-প্রকার, অবস্থা বুঝতে পারে, জড়াতীত পদার্থের উপর এই সকল ইন্দ্রিয়ের কোনই অধিকার নেই।(কিমিয়ায়ে সা’দাত)

ইন্ডিয়ার গুজরাটের মাহসানায় বাস করতেন যুবরাজ সিং। পরবর্তিতে তিনি ইসলাম গ্রহনে ধন্য হয়েছেন। তার নাম রাখা হয়েছিল সুহাইল সিদ্দিকী। তিনি বলেন ইসলাম কবুল করার পর আমার হিন্দু বন্ধুরা বলতো, দেখ! আমরা যে ভগবান মূর্তির পূজা করছি সে ভগবান তো অন্তত আমাদের সাথে আছে। মুসলমানরা যে খোদার পূজা করে সে খোদাকে কি কেউ কখনও দেখেছে? আমি তাদেরকে বলতাম আচ্ছা, তোমরা যে বাতাস থেকে শ্বাস গ্রহন করো সেখানে কি অক্সিজেন নেই? তারা বলতো, অক্সিজেন না থাকলে তো আমরা মরেই যাবো। আমি বলতাম, যে অক্সিজেন থেকে তোমরা শ্বাস নাও কখনও কি সে অক্সিজেন দেখেছো? তারা বলতো আমরা আমাদের বিবেক দ্বারা অনুভব করতে পারি। আমি বলতাম, না দেখে তোমরা অক্সিজেন কে অনুভব করো, বিশ্বাস করো অথচ অক্সিজেনের সৃষ্টিকর্তাকে অনুভব করতে পারো না, বিশ্বাস করতে পারো না। তোমাদের বিবেক বুদ্ধির উপর আমার বড় আক্ষেপ হয়।(ঈমানজাগানিয়া সাক্ষাৎকার)

আমরা যদি বিদ্যুৎ শক্তি, চুম্বুকত্ব, বাতাস, তাপ নিয়ে চিন্তা করি এগুলো কখনো দেখা যায় না। খুব বেশি হলে অনুভব বা অনুমান করা যায় মাত্র। 

বিদ্যুৎ শক্তি কেউ কোনোদিন দেখেনি কিন্তু এই বিদ্যুৎ শক্তির প্রভাবে যখন বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে চারিদিক আলোকিত করে তখন এর উপস্থিতি অনুভব করা যায়, যখন বৈদ্যুতিক পাখা ঘোরে আর আমাদের গায়ে বাতাস লাগে তখন এর উপস্থিতি অনুভব করা যায়, যখন বিদ্যুৎ শক্তি কোন লৌহ দন্ডকে গরম করে তখন এর উপস্থিতি অনুভব করা যায়।

বাতাসের কথা চিন্তা করুন বাতাস কেউ কোনোদিন দেখেনি কিন্তু অনুভব করা যায়। প্রচন্ড গরমে মৃদু বাতাস যখন আমাদের শরীর শীতল করে, সাইক্লোনে যখন বাড়ি ঘর চুরমার করে দেয় তখন বাতাসের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। 

একটি লৌহ দন্ড ঠান্ড না গরম তা দেখা যায় না কিন্তু হাত দিলেই তা অনুভব করা যায়।

আবার বস্ত্তজগতের অনেক কিছুরই যেমন- ইথার, কসমিক-রে, রেডিও ওয়েভ ইত্যাদির সঠিক বর্ণনা দেওয়া যায় না। তাই বলে সেসবের অস্তিত্ব আমরা অস্বীকার করতে পারি না। 

আমরা দেখেছি, অদৃশ্য করোনার ভয়াল থাবায় বিশ্ব আজ লণ্ডভণ্ড। পৃথিবীর বড় বড় ক্ষমতাধর, প্রযুক্তিবিদ ও সম্পদশালীরা দিগ্বিদিক হারিয়ে হতবিহব্বল। সারাবিশ্বে প্রায় চার লাখের মতো মানুষ ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে। অর্থাৎ চোখে দৃশ্যমান না এমন একটা ক্ষুদ্রতি ক্ষুদ্র অনুজীব দিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের অভিজ্ঞতাবাদকে ভুল প্রমানিত করে দেখালেন। যদি আমরা চিন্তাশীল হই।

পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা বহু জায়গায় ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।

করোনা হতে আমরা শিখলাম, কোন কিছুর দৃশ্যমান না হওয়াই তাঁর অস্তিত্বহীনতার প্রমাণ নয়। 

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিকটা বুঝার তৌফিক দান করুন।(আমিন)

লেখক:

বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা

Check Also

ইলিশ

জালে ধরা পড়েনি ইলিশ জেলে মহাজনদের মাথায় হাত

শরণখোলা (বাগেরহাট) থেকে মেহেদী হাসান :    ৬৫ দিনের অবরোধ শেষে সাগরে গিয়ে অনেকেই ফিরেছেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *