Thursday , October 29 2020
Breaking News
Home / খবর / মোরার আঘাতে লন্ডভন্ড উপকূল অঞ্চল

মোরার আঘাতে লন্ডভন্ড উপকূল অঞ্চল

৯ জনের প্রাণহানি হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকারে ৫ জেলা

স্টাফরিপোটার : ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কঙ্বাজারে ৪ জন, পেকুয়ায় ১ জন, মহেশখালীতে ১ জন, রাঙামাটিতে ২ জন ও ভোলায় ১ জন মারা গেছেন। গাছপালা পড়ে ও ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে অনেকে আহত হয়েছেন। কঙ্বাজার-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করার পর দুর্বল হয়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’। এ কারণে উপকূলীয় এলাকা ও নদীবন্দরগুলোকে মহাবিপদ সংকেত নামিয়ে এর পরিবর্তে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদফতর। ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ উপদ্রুত উপকূলীয় এলাকার ১৫টি জেলার ৪ লাখ ৬৮ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ৪শ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়াও ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতের কারণে চট্টগ্রাম, কঙ্বাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, কঙ্বাজারে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে ঝড় থেকে বাঁচতে আশ্রয়কেন্দ্রে আসার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১ জনের মৃত্যু হয়। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ইসলামাবাদ ইউনিয়নে আরও ১ জনের মৃত্যু হয়। তারা হলেন- কঙ্বাজার পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের ৬নং জেডিঘাট এলাকার বদিউল আলমের স্ত্রী মরিয়ম বেগম (৫৫) এবং ইসলামাবাদ ইউনিয়নের পাহাড়ি গ্রাম গজালিয়ার শাহিনা আক্তার (১০)। কঙ্বাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে ঝড় থেকে বাঁচতে আশ্রয়কেন্দ্রে আসার কিছুক্ষণ পরই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মরিয়মের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে শাহিনা গাছচাপা পড়ে মারা যায় বলে জানান কঙ্বাজার সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম। এছাড়া চকরিয়ার বড়ভেওয়া এলাকার মৃত নূর আলম সিকদারের স্ত্রী সায়েরা খাতুন (৬৫) ও একই উপজেলার পূর্ব জুমখালী এলাকার আবদুল জব্বারের ছেলে রহমত উল্লাহ (৫০) মারা যান। তারা ঝড়ে গাছচাপায় মারা যান বলে জানান জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন।

এদিকে রাঙামাটিতে বেলা সাড়ে ১১টায় গাছচাপা পড়ে আহত ২ জন রাঙামাটি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তারা হলেন- রাঙামাটি সদরের আফাম বস্তির হাজেরা বেগম (৪৫) এবং মুসলিম পাড়ার জাহেদা সুলতানা মাহিয়া (১৫)। রাঙামাটি সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক আবু তৈয়ব এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

অপরদিকে ভোলার মনপুরা আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে মায়ের কোলে ১ বছর বয়সী ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কলাতলীর চর সিপিপি ইউনিট টিম লিডার মো. নাজিমউদ্দিন শিশু মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কলাতলীর চর সিপিপি ইউনিট টিম লিডার মো. নাজিমউদ্দিন জানান, ঘূর্ণিঝড় মোরা আতঙ্কে স্থানীয় আবাসন বাজার থেকে ছালাউদ্দিনের স্ত্রী জরিফা খাতুন তার ১ বছর বয়সী ছেলে রাশেদমনিকে কোলে নিয়ে গত সোমবার রাত ১টার সময় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য রওনা দেয়। মনির বাজারের কাছে মনপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে প্রচন্ড বৃষ্টি ও ঠান্ডা বাতাসে শিশুটির ঠান্ডা লেগে যায়। ঠান্ডায় শিশুটি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথেই মারা যায়।

কুতুবদিয়া প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে উপকূলীয় জেলা কঙ্বাজারের দ্বীপ উপজলা কুতুবদিয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ঘূর্ণিঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ৬ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঝড়ে মানুষের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও বিভিন্ন গাছপালাও উপড়ে পড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে প্রবল ঘূর্ণিঝড়টি কঙ্বাজার উপকূল অতিক্রমের সময় এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ‘মোরা’র প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ারে উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঐ এলাকার বিভিন্ন ফসলও।

কুতুবদিয়া লাইট হাউজ সমাজ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ডা. সাইয়েদুল মনির বলেন, এককথায় ল-ভ- হয়ে গেছে সবকিছু। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় নারী, শিশু এবং বৃদ্ধরা। কিছু কিছু এলাকায় বাড়িঘরে পানি উঠে গেছে। বাকি গ্রামগুলোও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মহেশখালী (কঙ্বাজার) প্রতিনিধি জানায়, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে কঙ্বাজারের মহেশখালী ল-ভ- হয়ে গেছে। বিভিন্ন সড়কে গাছ পড়ে ও চলমান গাড়ি বিকল হয়ে সড়ক বন্ধ হয়ে আছে। ধলঘাটা, মাতারবাড়ি, সোনাদিয়া ও তাজিয়াকাটা এলাকা জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিভীষণ কান্তি দাশ জানান, ৩০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনা হয়েছে।

পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানায়, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ চট্টগ্রাম-কঙ্বাজার দিয়ে বয়ে যাওয়ার কারণে পটিয়া উপজেলা ও পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে আঘাত হেনেছে। এতে পাশের কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা, চরপাথরঘাটা ও শিকলবাহা ইউনিয়নে বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পটিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতির দৃশ্য চোখে পড়ে। খরনা, কেলিশহর, হা ঈদগাঁও, কচুয়াই এলাকায় বর্ষা মৌসুমের জন্য রোপণ করা শসা, ঝিঙ্গা, বরবটি, কাকরল, করলা, লাউসহ বিভিন্ন ফসল ‘মোরার’ বাতাসের তীব্র বেগে ল-ভ- হয়ে গেছে। এছাড়া কয়েক লাখ টাকার মাছের পোনা পানিতে ভেসে গেছে। ঝড়ে এবং গাছপালার আঘাতে অর্ধশতাধিক কাঁচাঘরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে চট্টগ্রাম বিভাগের ৫ জেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জেলাগুলো হলো-চট্টগ্রাম, কঙ্বাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টায় ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ প্রায় ১৩৫ কি.মি. গতিতে চট্টগ্রাম-কঙ্বাজার উপকূলে আঘাত হানে। এতে উপড়ে পড়ে বহু গাছপালা, বিদ্যুতের খুঁটি ও কাঁচা-আধাপাকা ঘরবাড়িসহ নানা স্থাপনা।

রাজধানীর সদরঘাট টার্মিনাল থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। তবে ঢাকা নদী বন্দরে এখনও ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত বহাল রয়েছে। এ কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত শুধুমাত্র ৬৫ ফুট বা তার বেশি দৈর্ঘ্যের লঞ্চগুলো চলাচল করতে পারবে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা আড়াইটার দিকে নৌচলাচলের ওপর এমন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল কর্তৃপক্ষ (বিআইডবিস্নউটিএ)। প্রতিষ্ঠানটির যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র কারণে গত সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে ঢাকা সদরঘাট টার্মিনালসহ অভ্যন্তরীণ রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় বিআইডবিস্নউটিএ। আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান জানান, কঙ্বাজার-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করার পর দুর্বল হয়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’। এ কারণে উপকূলীয় এলাকা ও নদীবন্দরগুলোকে মহাবিপদ সংকেত নামিয়ে এর পরিবর্তে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদফতর।

গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ত্রাণ সচিবের দায়িত্বে থাকা এ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গোলাম মোস্তফা বলেন, ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ অনুযায়ী কাজ করবো। যেখানে বাড়িঘর দরকার হবে বাড়িঘর প্রস্তুত করে দেব, টিন দেব, খাবার দিচ্ছি। কৃষিতে পুনর্বাসনের জন্য ?কৃষি বিভাগের সঙ্গে কথা বলবো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে ক্ষতি হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবো। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে স্ব স্ব বিভাগের সঙ্গে কথা বলে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে পদক্ষেপ নেব। তিনি বলেন, ‘মোরা’র কারণে চট্টগ্রাম, কঙ্বাজার, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা ও বরগুনা জেলার জন্য ১ হাজার ৪শ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ১৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের মোট ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, লাগলে আরও অর্থ দেব, আমরা প্রস্তুত আছি। মহাবিপদ সংকেতের পর ৪ লাখ ৬৮ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হয়েছিল জানিয়ে অতিরিক্ত সচিব বলেন, দেশে ৩ হাজার ৬শ আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও এর বাইরেও মসজিদ, মাদ্রাসা এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিল।

সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ও ২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ত্রাণ দেয়া হয়েছে।

 

Check Also

ছৈয়দ আন্ওয়ার

হে, একুশ শতকের সেরা প্রজন্ম! ছৈয়দ আন্ওয়ার

  হে, একুশ শতকের সেরা প্রজন্ম তোমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের দেশে দেশে চলমান সংকট …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *